রেমিট্যান্স-ইস্যুতে ধুঁকছে অর্থনীতি

বাংলাদেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। কিন্তু এই খাত থেকে আমাদের আয়ের ৬০ ভাগই চলে যায় তৈরি পোশাকের কাঁচামাল আমদানিতে। এ পরিস্থিতিতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় একক অবদান রেখে আসছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রবাসীরা রাষ্ট্রের কোনো সুবিধা ভোগ না করে দেশের সীমানার বাইরে গিয়ে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন।

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের এই অর্জনে ভাটা শুরু হয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যত্ অর্থনীতিতে নতুন শঙ্কা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে আর্থিক সূচকেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে দেশের চলতি হিসাবেও ঋণাত্মক ধারা নেমে এসেছে। অথচ এক বছর আগেও চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল ১২৪ কোটি ডলার, যা বর্তমানে এক কোটি ৬০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়ে গেছে।

ভালো কর্মসংস্থানের খোঁজে দেশের তরুণ-যুবকদের বড় একটি অংশ বিদেশে পাড়ি দেয়। আবার বিদেশে কাজে গিয়ে অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেতনও বাড়ে। সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবছর রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারা আর বজায় নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল প্রবাসী আয়ের প্রবাহ। ২০০০-০১ অর্থবছরে এসে প্রবাসী আয়ে প্রথম ছন্দপতন হয়। এরপর থেকে প্রবাসী আয়ের গতি বাড়তে থাকে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ের পরিমাণ হাজার কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। এভাবে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধির ধারায় আবারও ধাক্কা লাগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে ২৩ কোটি ডলার বা ১ দশমিক ৬২ শতাংশ রেমিট্যান্স কমে যায়। এর পরের অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বাড়লেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসে আবার কমে যায়। এবার কমে ৩৮ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের প্রবাসী আয়, যা শতকরা হিসাবে আড়াই ভাগ কমে যায়।

রেমিট্যান্স প্রবাহের নেতিবাচক ধারা চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ নভেম্বরে ’১৬ একক মাস হিসাবে বিগত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এ মাসে এসেছিল ৯৫ কোটি ১৩ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স। আর ২৩ ডিসেম্বর ’১৬ পর্যন্ত রেমিট্যান্স আহরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার, যা নেতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ সালে প্রবাসীদের পাঠানো মোট এক হাজার ৫৩১ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকগুলো আহরণ করেছে, যা ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ সময় রেমিট্যান্স এসেছে এক হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। সুতরাং ২০১৬ সালে একক বছরেই রেমিট্যান্স কমেছে সাড়ে ১২ শতাংশ। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ সময়কালের আয় যুক্ত করলেও রেমিট্যান্স কমার হার ১২ শতাংশের কম হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রবাসী আয় কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে এ পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তার মতে, রেমিট্যান্স কমার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ সক্রিয় রয়েছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে দীর্ঘ অস্থিরতা ও তেলের দর পড়ায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের আয়ও কমে গেছে। এতে তারা দেশে কম পরিমাণের অর্থ পাঠাচ্ছেন। সেক্ষেত্রে হয়তো তারা কিছুটা সময়ও নিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য কম থাকায় প্রবাসীরা আগের মতো অর্থ পাঠাচ্ছেন না। তাছাড়া ব্যাংকের তুলনায় খোলাবাজারে ডলারের মূল্য বেশি থাকায় ভিন্ন উপায়ে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে ঢুকছে। তৃতীয়ত, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহারে হুন্ডিওয়ালারা অবৈধ উপায়ে টাকা দ্রুত প্রবাসীর আত্মীয়ের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। যেহেতু এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ কাগজবিহীন ও যেকোনো সময় করা যায়, তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও সতর্ক মনিটরিংয়ের পরামর্শ দেন তিনি।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিক পতনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারাও উদ্বিগ্ন। সম্প্রতি কয়েক দফায় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেও কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। এমনকি মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রদানকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিকাশের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। হুন্ডিওয়ালারা যাকে কোনোভাবেই বিকাশ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে না পাঠায় সে ব্যাপারে কড়া বার্তাও দেয়া হয়েছে। তবুও কোনো কাজে আসছে না। ব্যাংক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষুদ্র অঙ্কের রেমিট্যান্স এখন আর ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে না। মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশ বা অন্য কোনো মাধ্যমে অবৈধপথে অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে।

Post Author: abubakar siddik

Leave a Reply