মেহেদী হাসান বিশেষ প্রতিনিধি:- বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে দুই ধরনের ঋণ সহায়তা পাবে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। এর একটি হচ্ছে মন্দার শুরুতে আইএমএফ’র কাছে সরকার যে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ চেয়েছে সেটি এবং অন্যটি আইএমএফ’র নতুন গঠিত সহনশীল ও টেকসই ট্রাস্ট ফান্ড থেকে।
শুক্রবার প্রকাশিত আঞ্চলিত অর্থনীতিবিষয়ক আইএমএফ’র প্রতিবেদনে এ আভাস দেওয়া হয়েছে।প্রতিবেদনে বলা হয়, এই দুটি ঋণই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কা মোকাবিলা করতে দৃঢ়ভাবে সহায়তা করবে। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রভাব এবং পণ্যের উচ্চমূল্য করোনা মহামারি থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গতি ম্লান করে দিয়েছে। এ কারণে সংকটের শুরু থেকেই সরকার আইএমএফ’র কাছে আগাম ঋণ সহায়তা চেয়েছে।
আইএমএফ’র এ ঋণ সরকারের বৈদিশক ভারসাম্যকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। একই সঙ্গে দেশটি বৈশ্বিক মন্দা মোকাবিলায় সহনশীল ও টেকসই ট্রাস্ট ফান্ড থেকেও ঋণ সুবিধা পাবে। ফলে দেশের বৈদেশিক ভারসাম্য মোকাবিলা করা অনেকটা সহায়ক হবে।electromart-300×250প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য এখন বড় আকারের জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য তহবিল দরকার।
কেননা এ খাতে দেশটির অনেক বিনিয়োগ প্রয়োজন। আরও বলা হয়, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশে নেমে আসবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের হবে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিও হার বাংলাদেশের নিচে থাকবে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনে অর্থনীতিতে বড় মন্দা আসবে। কেননা তাদের হাউজিং খাত ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়েছিল। এখন এতে মন্দার টান পড়েছে। ফলে হাউজিংয়ে মন্দার ঢেউ চীনের সব খাতেই পড়বে। এ কারণে তাদের প্রবৃদ্ধিও কমে যাবে।মালদ্বীপের উন্নয়নে নেওয়া উচ্চ ঋণের কারণে দেশটি ঝুঁকিতে পড়বে। শ্রীলংকা এখন গুরুতর একটি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে তারা আইএমএফ’র সঙ্গে একটি ঋণ চুক্তিতে পৌঁছেছে। ফলে অর্থনীতি ২০২৪ সাল থেকে স্থিতিশীল হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।আইএমএফ’র প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসছে : বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এ মাসেই শুরু হবে।
এ লক্ষ্যে আইএমএফ’র একটি টিম আগামী সপ্তাহে ঢাকায় আসবে। টিমের সদস্যরা ঋণের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবেন। ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ’র বার্ষিক সভা চলাকালে সাইড লাইনে এসে সংস্থার এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।
সূত্র জানায়, ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে তারা বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতির ঝুঁকি ও সমস্যাগুলোর একটি মূল্যায়ন করবেন। একই সঙ্গে আইএমএফ’র শর্তগুলো কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে সেটি পর্যালোচনা করবেন। ইতোমধ্যে সরকার আইএমএফ’র ঋণ পাওয়ার জন্য প্রধান চারটি শর্ত বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমিয়েছে। সারের দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়িয়েছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস হিসাবের পাশাপাশি নিট হিসাবও করছে এবং তা নিয়মিতভাবে আইএমএফকে দিচ্ছে। এই চারটি প্রধান শর্ত বাস্তবায়ন করায় আইএমএফ’র ঋণ পেতে সরকার অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে ঋণের প্রথম কিস্তি ছাড় করতে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর আগে আইএমএফ’র কাছ থেকে জরুরি ভিত্তিতে ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।সূত্র আরও জানায়, গত ১০ অক্টোবর থেকে ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ’র বার্ষিক সাধারণ সভা শুরু হয়েছে।
চলবে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত। ওই সভায় বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে অর্থসচিবসহ একটি প্রতিনিধি দল যোগ দিয়েছে। সভায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিনিধি দলটি সাইড লাইনে বিভিন্ন দেশের সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করছে। বৃহস্পতিবার শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান ও জেপি মর্গানের সঙ্গে বৈঠক করে।
ইতোমধ্যে আইএমএফ’র সঙ্গেও প্রতিনিধি দলের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশ জরুরি ভিত্তিতে ঋণ চেয়েছে এবং ঋণের কিছু শর্ত বাস্তবায়নও হয়ে গেছে-এ কারণে দ্রুতই ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে রপ্তানির চেয়ে আমদানি ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যাওয়ায় ও রেমিট্যান্স কমে যাওয়ায় বাজারে ডলারের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে রিজার্ভ থেকে ডলার দিয়ে বাজারের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। এভাবে রিজার্ভ থেকে বেশিদিন ডলারের জোগান দেওয়াও সম্ভব নয়। এ কারণে ডলার সংকট মোকাবিলা করতে সরকার আইএমএফসহ বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কাছে ঋণ সহায়তা চেয়েছে।
আইএমএফ’র কাছ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হতে পারে। জুলাইয়ে সরকার থেকে আইএমএফ’র কাছে চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণ চাওয়া হয়েছে। ১৪ জুলাই আইএমএফ’র একটি মিশন বাংলাদেশে এসে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক করে গেছে। দলটি ২২ জুলাই ঢাকা ত্যাগ করে।






