স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
আজ ১২ ভাদ্র, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এই দিনে তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন পিজি হাসপাতাল) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাকে স্মরণ করছে। তার ক্ষণজন্মা জীবন, সৃষ্টিশীলতা এবং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তার অসামান্য অবদান আজও আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।
জীবনের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা
১৮৯৯ সালের ২৫ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাত্র ৪৩ বছর সুস্থ জীবন পেয়েছিলেন, যার মধ্যে মাত্র ২২ বছর তিনি সাহিত্য সাধনা করেছেন। দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি থেমে থাকেননি। শৈশবে লেটো দলে যোগ দেওয়া থেকে শুরু করে রুটির দোকানে কাজ করা—সবকিছুই তার সংগ্রামী জীবনের অংশ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈনিক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এবং সেখানে বসেই সাহিত্যচর্চা শুরু করেন।
বিদ্রোহী কবির উত্থান
নজরুল ছিলেন একাধারে বিদ্রোহী, প্রেম ও মানবতার কবি। ১৯২১ সালে তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হলে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। এই কবিতা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ হিসেবে কাজ করে। তার অগ্নিঝরা লেখনী অন্যায়, শোষণ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছিল। তিনি ছিলেন শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর।
সাহিত্যের বৈচিত্র্য
নজরুল কেবল কবিতা নয়, বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের এক বিশাল অংশ জুড়ে আছেন। তার সৃষ্টিকর্মের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, এবং সঙ্গীত। তিনি প্রায় তিন হাজারেরও বেশি গান রচনা করেছেন, যা ‘নজরুলগীতি’ নামে পরিচিত। এই গানগুলোতে প্রেম, প্রকৃতি, মানবতা, বিদ্রোহ এবং আধ্যাত্মিকতার এক অসাধারণ মিশেল পাওয়া যায়। তিনি বাংলা গানে নতুন ধারার প্রবর্তন করেন এবং নিজস্ব সুরের মাধ্যমে এক স্বতন্ত্র শৈলী গড়ে তোলেন। ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘সঞ্চিতা’ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। ‘মৃত্যুক্ষুধা’ ও ‘কুলি-মজুর’ তার সামাজিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন ও জাতীয় কবির মর্যাদা
১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে ভারত থেকে সপরিবারে নিয়ে আসা হয়। ১৯৭৫ সালে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট উপাধি প্রদান করা হয়। ১৯৭৬ সালে তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। একই বছর তাকে একুশে পদকও প্রদান করা হয়।
আজকের আয়োজন
কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ সারাদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন কবির সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। তার স্মৃতিতে আলোচনা সভা, সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে। তার সৃষ্টি আজও আমাদের চেতনার প্রতীক। তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে চিরকাল আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।







