নাজমুল হাসান পাবনা জেলা প্রতিনিধি// প্রতিষ্ঠার একযুগ পরেও অনিয়ম অব্যবস্থাপনায় বেহাল পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সাবেক উপাচার্য এম রোস্তম আলীর দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে দুর্নীতির আখড়া। শিক্ষার পরিবেশ নষ্টের পাশাপাশি সেশনজটসহ নানা সমস্যায় ক্ষতির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা।
২০০৮ সালের ৫ জুন আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না বিশ্ববিদ্যালয়টির। তবে অতীতের সব অভিযোগের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় সদ্য বিদায়ী উপাচার্য এম রোস্তম আলীর সময়। ২০১৯ সালের ৬ মার্চ দায়িত্ব পান রোস্তম আলী।
জড়িয়ে পড়েন ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা নয়ছয়’সহ নানা দুর্নীতিতে। প্রতিবাদে বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ মিছিলসহ অনশন কর্মসূচি করেন শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম বলেন, উপাচার্যের দুর্নীতির জন্য সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে।
শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মোহাম্মদ আওয়াল কবির জয় বলেন, উপাচার্যের সীমাহীন দুর্নীতির জন্য আজ বিশ্ববিদ্যালয় কলঙ্কিত হয়ে উঠেছে। এদিকে, উপাচার্যের অবসরের পর বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনও অভিভাবক শূন্য; দেখা দিয়েছে প্রশাসনিক নানা জটিলতা।
ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বিজন কুমার ব্রহ্ম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন নানা জটিলতায় ভুগছে। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা হয়তো মার্চ মাসের বেতন-ভাতা পাবেন না।
এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ভিসি নিয়োগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়ার দাবি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের। সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জহুরুল ইসলাম প্রিন্স বলেন, এভাবে চলতে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ও তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে উপাচার্য এম রোস্তম আলীর বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে।
তবে এ বিষয়ে তাঁর মোবাইলে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।টানা চার সপ্তাহ ধরে তালাবদ্ধ রেজিস্ট্রার কার্যালয়। চলছে না কোনোরকম দাপ্তরিক কার্যক্রম। ৬ই মার্চ উপাচার্যের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯ দিন আগেই দায়িত্ব বুঝিয়ে না দিয়ে কাউকে কিছু না বলে নীরবে ক্যাম্পাস ছাড়েন উপাচার্য। তাঁর মেয়াদকালে সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের পদ ছিল শূন্য।
এখনো চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ছাত্র উপদেষ্টার অপসারণ দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। এমন পরিস্থিতিতে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) শিক্ষা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
শিক্ষক-কর্মকর্তারাও ঠিকমতো ক্যাম্পাসে আসেন না।বিভাগগুলোতে দু-একটি ছিটেফোটা ক্লাস হলেও এতে দীর্ঘমেয়াদি সেশনজটের আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা।এই সপ্তাহের মধ্যে ভিসি নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি না হলে শিক্ষক কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন বন্ধ হবার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সরজমিনে দেখা যায়, রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে তালা ঝুলছে। প্রশাসনিক ভবনের অধিকাংশ কার্যালয় বন্ধ। কর্মকর্তাদের অনেকেই কার্যালয়ে নেই। বিভাগগুলোতে গিয়ে একই দৃশ্য চোখে পড়ে। শিক্ষার্থীরা জটলা করে বেড়াচ্ছে। কর্মস্থলে নেই বেশিরভাগ শিক্ষক।
কয়েক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, গত চার বছরে উপাচার্য এম রোস্তম আলী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন। নিজে নিয়োগ বোর্ডের সভাপতি হয়ে ভাতিজা-ভাগনেদের চাকরি দিয়ে নিজ স্বার্থ উদ্ধার করে চুপিসারে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত।
সবাই যার যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। শিক্ষার্থীদের দিকে কারও নজর নেই। নামমাত্র ক্লাস চললেও পরীক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ আছে। যাদের পরীক্ষা হয়েছে তাদের ফল প্রকাশ হচ্ছে না।
উপাচার্যের অদক্ষতার কারণে এমনিতেই দুই বছরের বেশি সেশনজট তৈরি হয়ে আছে। এভাবে চলতে থাকলে আরও দীর্ঘমেয়াদি জট তৈরি হবে।এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা সমিরন কুমার সাহা বলেন, ‘পরীক্ষা কার্যক্রম একেবারে চলছে না, এটা ঠিক না। বিভিন্ন বিভাগের স্পোর্টস কার্যক্রম চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগের সংখ্যা ১৯।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান সমস্যার সমাধান দ্রুত হওয়া প্রয়োজন।’বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আবদুল আলীম বলেন, ‘রোস্তম সাহেব ছিলেন একজন পুরোপুরি অদক্ষ উপাচার্য। তিনি একাডেমিক, প্রশাসনিকসহ সব ক্ষেত্রেই জটিলতা তৈরি করে নিজের আখের গুছিয়ে মেয়াদ পূর্তির আগেই পালিয়ে গেছেন।
এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় এখন মহাসংকটে। সংকট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচাতে হলে এখনই প্রশাসনিক ও একাডেমিক দক্ষতাসম্পন্ন উপাচার্য প্রয়োজন।’কর্মকর্তা পরিষদের সভাপতি হারুনার রশিদ বলেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ ১৪ই মার্চ শেষ হলেও নতুন পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারাই কমিটির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তালা বন্ধ থাকবে। নতুন উপাচার্য এলে আলোচনা সাপেক্ষে তালা খোলার সিদ্ধান্ত হবে।রেজিস্ট্রার (চলতি দায়িত্ব) বিজন কুমার ব্রহ্ম জানান, ‘নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। চরম সংকট চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে।
সব মিলিয়ে সব কিছুতেই কেমন যেন স্থবিরতা নেমে এসেছে। দ্রুত উপাচার্য নিয়োগ না হলে সমস্যা আরও বাড়বে।







