স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। এর তিন দিন পর, ৮ আগস্ট সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই দিন গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে সরকারের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় প্যারিসে অবস্থানরত ইউনূসকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি ওঠে আন্দোলনরত ছাত্র ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে। অবশেষে কোটি মানুষের প্রত্যাশা ও সমর্থনে তিনি দায়িত্ব নিতে সম্মত হন।
রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা ফেরানোই ছিল প্রথম চ্যালেঞ্জ
সরকার গঠনের শুরুতে ড. ইউনূসকে যেসব বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়, তার অন্যতম ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা। দেশের পুলিশ প্রশাসন তখন প্রায় অকার্যকর। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সরকার দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কঠোর অবস্থান গ্রহণের ঘোষণা দেয়। তবে সবমিলিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী পুনর্গঠন করে জনগণের আস্থা অর্জনে সরকারকে বেগ পেতে হয়েছে।
সন্ত্রাস দমন, সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান এবং শহরাঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করার ওপর ছিল সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব। বিশেষ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম কঠোরভাবে দমন করা হয়েছে।
রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে, যার ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা সম্ভব হয়। টেকনাফ ও কক্সবাজার অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
অনলাইন জালিয়াতি, হ্যাকিং এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইম ইউনিট সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ভুয়া তথ্য প্রচার ও ডিজিটাল প্রতারণা বন্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।
রাষ্ট্র সংস্কারে ১১ কমিশন : নীতিগত রূপান্তরের রূপরেখা
দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার প্রতিশ্রুতি দেয় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের। প্রথম ধাপে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন- এই ছয়টি খাতে পৃথক কমিশন গঠন করা হয়। পরে আরও পাঁচটি যুক্ত হলে কমিশনের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০টি। কমিশনগুলো হলো- ‘গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন’, ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন’, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন’, ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’, ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’, ‘বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন’, ‘শ্রম সংস্কার কমিশন’, ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’, ‘স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন’ ও ‘স্বাস্থ্য খাত
সংস্কার কমিশন’।
এসব কমিশন এরইমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে রয়েছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ। কমিশনগুলোর প্রতিবেদনে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ রয়েছে। সেগুলোর দিকে সুনজর রয়েছে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক উপদেষ্টা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজও এগিয়ে চলেছে। নানা সংকট, সংশয়ের পরেও তারা চলতি জুলাইয়ের মধ্যেই একটি চূড়ান্ত রূপরেখা দিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে সংসদীয় ব্যবস্থা আরও কার্যকর করার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবং নির্বাচন কমিশন সংস্কারের সুপারিশও রয়েছে। বিচার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে বিচারকদের নিয়োগ ও প্রেষণ নীতিতে পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কার্যকারিতা বাড়াতে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এই সংস্কারগুলোকে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের শাসন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জাতীয় ঐকমত্য ও জুলাই সনদ: রাজনৈতিক কাঠামোর খসড়া
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে একটি সর্বজনগ্রাহ্য রাজনৈতিক কাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। লক্ষ্য- ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি জাতীয় অঙ্গীকারপত্র চূড়ান্ত করা, যাতে রাজনৈতিক দলগুলো সই করতে পারে।
কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে পাঁচটি বিষয়ে আলোচনা এগিয়েছে: রাষ্ট্রের মূলনীতি, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি এবং নারী প্রতিনিধিত্ব।
কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার প্রক্রিয়া ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। কমিশন কোনও কিছু চাপিয়ে দিচ্ছে না; বরং অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে স্থিতিশীলতা অর্জনের চেষ্টা
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও উন্নয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই এক বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করা হচ্ছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রণয়ন, যা কার্যকর হয়েছে গত ১ জুলাই থেকে। এক্ষেত্রে দাতাগোষ্ঠী বিশেষ করে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুসরণ করে দেশীয় সম্পদের সদ্ব্যবহার ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা প্রদানে যথেষ্ট দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। সদ্য সমাপ্ত জুনে দেশের সেই ডাবল ডিজিটের মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। বাজার তদারকি জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা এবং মুদ্রানীতিতে কিছু কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগে ধস: বড় সীমাবদ্ধতা
সরকারের বড় সীমাবদ্ধতাগুলোর একটি হলো বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, সদ্যবিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ ৯১ কোটি ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে (জুলাই-এপ্রিল) ছিল ১২৭ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৪১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার।
২০২২-২৩ অর্থবছরে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৬০ কোটি ৫৪ লাখ ডলার। তার আগের ২০২১-২২ অর্থবছরে বিনিয়োগ হয়েছিল ১৭১ কোটি ডলার। করোনার সময়ে ২০২০-২১ অর্থবছরেও বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ১৩২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগ এসেছিল ১২০ কোটি ডলার। করোনার আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিনিয়োগ এসেছিল ৩৪৮ কোটি ডলার। গত ১৪ বছরের মধ্যে বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগ সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরেও দেশে ১২০ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল। এরপর আর কোনও অর্থবছরে এর চেয়ে কম বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। আর এবার সেটা সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জানা গেছে, বিদেশি বিনিয়োগ ও পুনর্বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশ কম বিনিয়োগ পেয়েছে। গত অর্থবছরের শুরুতে জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে প্রথম
প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল মাত্র ১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। আর ছয় মাসে হয়েছিল ৫৯
কোটি ডলার।
গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ২১ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এসেছিল ৩৩ কোটি ডলার। এ হিসাবে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তা ৩৭ শতাংশ কম। তবে গত অর্থবছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে বিদেশিদের পুনর্বিনিয়োগ বেশি হয়েছে। প্রথম ছয় মাসে পুনর্বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি ডলার।
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে দেশে আয়োজন করা হয়েছিল ইনভেস্টমেন্ট সামিটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্ট। সেখানে ব্যাপক সাড়া মিলেছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। দেশের রফতানি খাত বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পকে চাঙা করতে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের নানা ধরনের সীমাবদ্ধতাও কাজ করছে বলে জানা গেছে।
কূটনীতিতে সক্রিয়তা ও ভারসাম্য রক্ষা
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনূস সরকারের গত এক বছরের অন্যতম বড় সাফল্য আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। মানবাধিকার ইস্যুতে সরকারের অবস্থান স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ার লক্ষ্যে আলোচনা চলছে, যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগে ভবিষ্যতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে বিশ্ব রাজনীতিতেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে সরকার কৌশলী ভূমিকা রাখছে।
গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে সরকার
সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার ছিল একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজন। এ উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা দফায় দফায় সংলাপ করেন। সর্বশেষ গত ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সরকার তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করছে। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সবার সহযোগিতা পেলে সরকারের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতিই রক্ষা করা সম্ভব।




