যশোরের কেশবপুর উপজেলার ১৪ শিক্ষার্থী মেডিকেলে চান্স

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Email

স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক

মেডিকেলে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে যশোরের কেশবপুর উপজেলার ১৪ জন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই গ্রাম থেকে উঠে আসা স্বল্প আয় ও সাধারণ পরিবারের সন্তান। এবার ভর্তির মেধা তালিকায় স্থান পাওয়া ১৪ শিক্ষার্থী হলেন- ইব্রাহিম আলম অভি, তিথি রাণী সাহা, খাদিজাতুল কুবরা, তন্ময় ঘোষ, তৌকির আহমেদ, তানভীর আহমেদ, খালিদ রেজা রাজন, রায়হান আহমেদ, নূরে শামীমা ইসলাম সাফা, জান্নাতুল মাওয়া তুবা, হাবিবা হালিম, সানিয়া নৌশিন, সুমাইয়া সারা ও নওরিন পুষ্প। তাদের সাথে কথা বলে অধিকাংশের চোখেমুখে দেখা যায় সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেই সব পরিবারে অভিভাবকদের মাঝে আনন্দের পরিবর্তে দুশ্চিন্তা নেমে এসেছে।

ইব্রাহিম আলম অভি: কাঠমিস্ত্রি জাহাঙ্গীর মোড়লের ৩ সন্তানের মধ্যে সবার বড় অভি। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে অভির মা মর্জিনা বেগম শ্রমজীবী হয়েও সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য আপোহীন। পৌরসভার ৯ নং বালিয়াডাঙ্গা ওয়ার্ডে তাদের বাড়ি। অভি দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু সন্তানের ভর্তি নিয়ে পিতামাতার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছায়া। জাহাঙ্গীর মোড়লের যে দিন কাজ হয় সেদিন ৫০০ টাকা মজুরী পান। তাতেই চলে তাদের সংসার। ছেলেকে কলেজে যেতে ভালো জামা-জুতা কিনে দিতে পারেনি। দিতে পারেনি ভালো কোন টিউশনী বা কোচিং। তবুও তার আশা ছেলে ডাক্তার হয়ে অসহায় মানুষের চিকিৎসায় মনযোগী হবে। তিথি রাণী সাহা: বালিয়াডাঙ্গা ওয়ার্ডের আরও এক মেধাবী মুখ তিথি রানী সাহা নীলফামারী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার বাবা কালিদাস সাহা মটরভ্যানে করে একটি কোম্পানীর মালামাল দোকানে দোকানে সরবরাহের কাজ করেন। মা মাধবী রানী সাহা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাপর ভেজে বিক্রি করেন। বাবা-মায়ের স্বল্প আয়ে ছোট্ট একটি টিনের ঘরে থেকে খেয়ে না খেয়ে দুই মেয়েকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। এখন মেয়েকে মেডিকেলে ভর্তি করাসহ পড়াশোনা করানো নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সবার সহযোগিতা নিয়ে গরীব ও অসহায় মানুষের সেবা করার জন্য তিথি ডাক্তার হতে চান।

খাদিজাতুল কুবরা: এক ছেলে এক মেয়েসহ যে দিন জয়নব বিবিকে তালাক দেয়া হয় তখন খাদিজার বয়স সাত বছর। দিশেহারা জয়নব বিবি তখন গোলাঘাটা মির্জাপুর গ্রামে মায়ের কাছে আশ্রয় নিয়ে ছেলে আব্দুল্লাহকে কাজ শিখতে একটি মটরসাইকেল গ্যারেজে রেখে আসেন আর মেয়ে খাজিদাকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করেন। সেই খাদিজা এবার বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে ভর্তির চান্স পাওয়ায় শ্রমজীবী জয়নব বিবির চোখে আজ আনন্দের অশ্রু। আজ পর্যন্ত তাদের বাবা কোন দিন খোঁজও নেয়নি। জীবন সংগ্রামী ভাই ও মায়ের প্রচেষ্টার সংসারে অনটনের মধ্যে ভালো কোন প্রাইভেট বা কোচিং ছাড়াই চান্স পাওয়া খাদিজা অসহায় দুখী মানুষের সেবা করতেই ডাক্তার হতে চান।

তন্ময় ঘোষ : ঐতিহ্যবাহি বিদ্যানন্দকাটি গ্রামের মেধাবী মুখ তন্ময় ঘোষ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার বাবা অনাথ ঘোষ বেসরকারী ছোট চাকুরে ও মা স্বপ্না ঘোষ গৃহিনী। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা তন্ময় অনেক সংগ্রাম করে লেখাপড়া করে আজ এ পর্যায়ে এসেছে। ডাক্তার হয়ে সে বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছে। তৌকির আহমেদ ও তানভীর আহমেদ : মঙ্গলকোট ইউনিয়নের বসুন্তিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক মহালদারের জমজ দুই ছেলে তৌকির আহমেদ ও তানভীর আহমেদ। তৌকির আহমেদ জাতীয় মেধায় ৭৬ তম হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও তানভির আহমেদ জাতীয় মেধায় ১৬০০ তম হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। সাধারণ কৃষিজীবী পরিবারে গৃহিনী শিরিনা আক্তারের চার ছেলেসহ ছয় সদস্যের পরিবার। চেহারা-গড়ন, চালচলনে একই দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার সব ক্ষেত্রে ফলাফলও এক। বসুন্তিয়া গ্রামের কেউ এমবিবিএস ডাক্তার না হওয়ায় দশম শ্রেণীতে উঠে দুইজনে মেডিকেলে পড়ার পরিকল্পনা করে তাদের জার্নি শুরু করে। দুই সন্তান মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় পরিবারে আনন্দের জোয়ারের পাশাপাশি একসাথে দুইজনের লেখাপড়ার ব্যয় নিয়ে আব্দুর রাজ্জাকের কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে।

খালিদ রেজা রাজন : উপজেলার সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের মেধাবী মুখ খালিদ রেজা রাজন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার বাবা রেজাউল ইসলাম স্থানীয় বাজারের একজন সাধারণ ব্যবসায়ী ও মা পারভীনা খাতুন গৃহিনী। ছোট বেলা থেকেই লেখাপড়ার ব্যাপারে সংগ্রামী রাজন একজন সফল চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করতে চান।

রায়হান আহমেদ : কৃষক আবুল কাশেম মালীর দুই ছেলে আর দুই মেয়ের মধ্যে সব চেয়ে মেধাবী রায়হান আহমেদ খুলনা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার মা লাইলী বেগম একজন সাধারণ গৃহিনী হয়েও সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যাপারে আপোষহীন। সংগ্রামী রায়হান প্রায় প্রতিদিন ৩০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তাদের বাড়ি বাটবিলা থেকে কেশবপুর হাসপাতালের পাশ দিয়ে কোমরপোল আইডিয়াল কলেজে ক্লাশ করতে আসতেন। আসা যাওয়ার মাঝেই ওই হাসপাতালের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখেতে সে আজ সফল হতে চলেছেন।

নূরে শামীমা ইসলাম সাফা : সুফলাকাটি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত সারুটিয়া গ্রামের ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের মেয়ে সাফা সিরাজগঞ্জ শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার মা শেফালী আক্তার গৃহিনী। প্রায় ৪০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে কেশবপুর সরকারী ডিগ্রী কলেজে আসা-যাওয়ার পর এইচএসসি পাশ করে ডাক্তারী পড়ে সে তার স্বপ্ন সফল করতে চলেছে। জান্নাতুল মাওয়া তুবা : সুফলাকাটি ইউনিয়নের নারায়ণপুর গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক আব্দুল জলিলের মেয়ে তুবা মাগুরা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার মা সামিয়া শাপলাও একটি মাদ্রাসার শিক্ষিকা। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা শিক্ষা সংগ্রামী তুবা ডাক্তারী পড়ে তার বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছে।

হাবিবা হালিম : সুফলাকাটি ইউনিয়নের কাটাখালি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আফরোজা খাতুনের মেয়ে হাবিবা সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার পিতা আব্দুল হালিমও নিজ গ্রাম মনোহরপুর বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক। অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ভবদহ কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করে হাবিবা ডাক্তারী পড়ে তার বাবা মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে চান। সানিয়া নৌশিন : পৌরসভার ৬ নং বাজিতপুর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শিক্ষক নজরুল ইসলামের মেয়ে সানিয়া নৌশিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার মা রওশন আরা বেলী কেশবপুর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। সানিয়া তার বড় বোনকে অনুসরণ করে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে আজ সফল হতে চলেছেন।

সুমাইয়া সারা : সাগরদাঁড়ি আবু শারাফ সাদেক কারিগরি ও বাণিজ্য মহাবিদ্যালয়ের কলেজের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল গণির মেয়ে সুমাইয়া সারা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার মা বেগম রোকেয়া খাতুন একজন গৃহিনী। সাগরদাঁড়ি ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া গ্রাম থেকে উঠে আসা সারা ডাক্তারী পড়ে তার বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছে। নওরিন পুষ্প : কেশবপুর সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক জামশেদ আলীর মেয়ে পুষ্প জামালপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তার মা মমতাজ সুলতানা নিজ গ্রাম বালিয়াডাঙ্গা পূর্বপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। এই শিক্ষক দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে বড় নওরিন পুষ্প মেডিকেলে পড়ে ভালো চিকিৎক হয়ে অসহায় মানুষের সেবা করতে চায়। তবে তারা সকলেই ভর্তি পরীক্ষায় এ সাফল্যের পিছনে কেশবপুরের দীনেশ দেবনাথ নামে এক শিক্ষককের ভূমিকার কথা জানিয়েছেন। ওই শিক্ষক তাদের ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করাসহ কারো কারো আর্থিক সহযোগিতাও করেছেন।

শিক্ষক দীনেশ দেবনাথ বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্তরিক আগ্রহ এবং অদম্য প্রচেষ্টায় এ সফলতা সম্ভব হয়েছে। তবে সংকট ও অভাব-অনটনে স্বল্প আয়ের পরিবারে সন্তানদের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন যেন ফিকে হয়ে না যায়। এজন্য তাদের লেখাপড়ায় সহযোগিতা করার জন্য দেশের দানশীল ব্যক্তিসহ সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।