স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে আটক যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলমকে নির্দোষ দাবি করে রাজপথে নেমেছেন জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। রোববার সকাল থেকে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদানের মাধ্যমে আটক কর্মকর্তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেন তারা। তবে এই আন্দোলনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রমে। বছরের শুরুতেই নিয়মিত পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ঢাকা থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম যশোরে পৌঁছালেও আন্দোলন থামেনি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ও যুগ্ম সচিব মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত দলে রয়েছেন উপ-পরিচালক তাপস অধিকারী ও খুলনার সহকারী পরিচালক ফজলে রহমান। তদন্ত টিম যশোর সার্কিট হাউজে অবস্থান করে আন্দোলনরত শিক্ষক নেতা ও মামলার বাদী নূর নবীর সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলেন।
সকালে আন্দোলনরত শিক্ষকরা সার্কিট হাউজে তদন্ত টিমের কাছে লিখিত বক্তব্য দেন। পরে দুপুরে যশোর প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
শিক্ষক নেতারা দাবি করছেন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানো হয়েছে। শিক্ষক নেতা জাহাঙ্গীর আলম, শাহিনুর রহমান ও আব্দুল জব্বার বলেন, নূর নবী নামের এক ব্যক্তির সাজানো ফাঁদে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। তাকে অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। তা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
তবে আন্দোলনের এই কর্মসূচির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সরেজমিনে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, বহু শিক্ষক ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। উপজেলা ও শহরতলীর অনেক শিক্ষক কেবল হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে জেলা শহরে চলে এসেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
যশোর রেলস্টেশন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মোট ৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার মধ্যে মাত্র ৩ জন স্কুলে উপস্থিত ছিলেন। বাকি ৪ জন শিক্ষক আন্দোলনে অংশ নিতে শহরে অবস্থান করছেন। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শায়লা আক্তার জানান, আন্দোলনের কারণে চারজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলেও বাকি তিনজন তিনটি শ্রেণির পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে কোনো লিখিত নির্দেশনা নেই।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লাভলী আক্তার বলেন, আমরা আন্দোলন থেকে ফিরে এসেছি। ক্লাস যথারীতি চলছে। আন্দোলনে যাওয়ার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। একাধিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অভিভাবক বলেন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা দোষী না নির্দোষ তা নির্ধারণ করবেন আইন ও আদালত। কিন্তু সেই অজুহাতে শিক্ষকদের রাস্তায় নামিয়ে শিক্ষার পরিবেশ ধ্বংস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের অভিযোগ, শিক্ষা অফিসের কোনো না কোনো স্তর থেকে শিক্ষকদের আন্দোলনে যেতে মৌখিকভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
অভিভাবকরা আরও বলেন, বছরের শুরুতেই শিশুদের নিয়মিত ক্লাসে সময় দেওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষকরা আন্দোলনে ব্যস্ত থাকায় শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় পাচ্ছে না। এতে করে প্রাথমিক শিক্ষার মান ও ধারাবাহিকতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার চলমান থাকা অবস্থায় শিক্ষকদের এভাবে রাজপথে নেমে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করা দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ। তারা দ্রুত আন্দোলন প্রত্যাহার করে বিদ্যালয়ে ফিরে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।




