স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
যশোর শহরের নিউমার্কেট এলাকার বাসিন্দা নাজিয়া খাতুন ছুটে এসেছেন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। উদ্দেশ্য তার শিশুকে হামের টিকা দেওয়া যাবে কি না, তা জানা। টিকা ইনচার্জের কক্ষে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি বলেন, “স্যার, আমাদের বাচ্চার আর টিকা দিতে হবে। টিভিতে দেখলাম হামে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। এর আগে একবার টিকা দিয়েছি, এখন খুব ভয় পাচ্ছি।”
আসলে হামের খবর শুনে ভয় পাওয়ার মতো পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে। সারাদেশের মতো যশোরেও হাম ছড়িয়ে পড়েছে।
সোমবার সকালে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডে রোগীর উপচে পড়া ভিড়। হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে অন্তত ৪ শিশুকে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
৯ মাস বয়সী শিশু সাদিয়ার শরীরজুড়ে লাল লাল র্যাশ, তীব্র জ্বর আর অসহ্য যন্ত্রণা। প্রথমে সাধারণ জ্বর ও ঠান্ডা নিয়ে ভর্তি হলেও গত তিন দিনে তার অবস্থার অবনতি হয়েছে। সাদিয়ার মা সাগরিকা জানান, শিশুটি এখন কিছুই খেতে পারছে না। ডাক্তাররা স্যালাইন ও বিশেষ ওষুধ দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, মাত্র চার মাস বয়সী মাহিরা নিউমোনিয়ার চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই হামের লক্ষণে আক্রান্ত হয়েছে। মাহিরার বাবা তামিম হোসেন বলেন, সব টিকা নিয়মিত দিলেও অসুস্থতার কারণে শেষ টিকাটা দেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই হামে আক্রান্ত হয়েছে।
চলতি মার্চ মাসেই যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ২২টি শিশু। এর মধ্যে ১৭ জনের বয়স ৯ মাসেরও কম। বিষয়টি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় না। তারা মায়ের শরীর থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সুরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু এত কম বয়সী শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি এখন গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শিরিন সুলতানা জানান, হাম ও পক্স আক্রান্ত রোগীর চাপ এত বেশি যে হাসপাতালে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আগে এই রোগের চিকিৎসা বাড়িতে হতো, এখন জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় সবাই হাসপাতালে আসছেন।
শিশু ওয়ার্ডের রেজিস্ট্রার ডা. আফসার আলী বলেন, গত তিন মাসে ৪৫ জন শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
হাসপাতালের টিকা ইনচার্জ নুরুল হক জানান, আজ ৫৩ ফাইল হামের টিকা পেয়েছি। এক ফাইলে ৫ জন শিশুকে টিকা দেওয়া সম্ভব। প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু টিকা নিতে আসে। আমরা আক্রান্তদের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠাচ্ছি।
এদিকে, হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আইসোলেশন ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ডায়রিয়া ওয়ার্ডকে আপাতত আইসোলেশন ইউনিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন রোগীদের পর্যবেক্ষণে রেখে নিশ্চিত হলেই আলাদা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনসচেতনতার অভাব এবং সময়মতো টিকা না নেওয়ার প্রবণতাই এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় টিকা কেনা বন্ধ থাকায় কিছু শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে এখন টিকা এসেছে এবং সরবরাহ প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যশোরে এখন পর্যন্ত হামে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, শিশুর জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
