পাঁচ নারীর পরনে সাদা শাড়ি, যে দৃশ্য সইবার নয়

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Email

ওসামম চট্টগ্রাম বিভাগীয় সংবাদদাতা:- টাঙানো রয়েছে নিহত পাঁচ ভাইয়ের ছবি, ছবির ওপর পরানো ফুলের মালা। পুরোহিত পাশে বসে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা চালাচ্ছেন। নিহত পাঁচ ভাইয়ের স্ত্রীদের সবার পরনে সাদা শাড়ি। যে দৃশ্য দেখে কেঁদেছে স্বজন, কেঁদেছে এলাকার মানুষ।এই দৃশ্য কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাট এলাকার মেমোরিয়াল খ্রিষ্টান হাসপাতালের পাশের গ্রাম হাসিনাপাড়ার। শুক্রবার সকাল থেকে মৃত অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিদর্শক সুরেশ চন্দ্রের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন–প্রতিবেশীর জটলা। বাড়ির উঠানে চলছে চকরিয়ার পিকআপের ধাক্কায় নিহত পাঁচ ভাইয়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠান।গেল মঙ্গলবার বেপরোয়া পিকআপ প্রাণ নিয়েছে পাঁচ নারীর স্বামীর।নিহত অনুপম সুশীলের স্ত্রী পপি সুশীল বলেন, আমার স্বামী ছিলেন পল্লিচিকিৎসক। চট্টগ্রামের আজিজনগর বাজারে তিনি রোগী দেখে সংসার চালাতেন, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতেন। কেউ এসে আমাদের কথা বলবে এমন কেউ নাই। কোথায় যাবো? কি করবো? সংসার কেউ দেখবে এরকম কেউ নাই আমাদের।

নিহত দীপক সুশীলের স্ত্রী পূজা সুশীল জানান, কোনদিন ভাবিনি স্বামীহারা হবো। আমার স্বামী কাতারপ্রবাসী ছিলেন। সেখানে তার একাধিক দোকান ছিল। বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে এসে পিকআপের চাপায় মারা গেলেন তিনি। এখন কাতারের দোকানের খবর নেওয়ার লোক নেই।নিহত আরেক ভাইয়ের স্ত্রী বলেন, আমার কোন ছেলে-মেয়ে নাই। কি নিয়ে থাকবো আমি। যদি বিচারটা না পাই মনকে কখনও শান্তনা দিতে পারবো না।১০ দিনের ব্যবধানে পাঁচ ছেলে ও স্বামীকে হারিয়ে নির্বাক সুরেশের স্ত্রী মানু রানী সুশীল (৫০)। শোকের বোঝা সামলে তাকেই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান দেখভাল করতে হয়।বাবার শ্রাদ্ধ পালন করে শ্মশান থেকে বাড়ি ফেরার পথে ৫ ভাইকে পিষে মারার ঘটনায় আহত আরেক ভাইও এখনও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।বৃদ্ধা মা মানু রানী কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ভগবান, রক্তিমকে ফিরিয়ে দাও। মায়ের কাছে পাঠিয়ে দাও। এ জীবনে আর কত পরীক্ষা নিবা ভগবান।

নিহত পাঁচ ভাইয়ের আদ্যশ্রাদ্ধে স্বজনদের মাঝে শোকের পাশাপাশি ছিল তীব্র ক্ষোভ। তাদের দাবি, ঘটনাটি কোনভাবেই দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘাতক গাড়ি জব্দ করা হলেও ঘটনার চারদিন পরও পুলিশ চালক ও মালিককে চিহ্নিত করতে না পারায় তারা জানিয়েছেন ক্ষোভ।নিহতদের এক স্বজন বলেন, হত্যাকাণ্ড নাকি দুর্ঘটনা তা বের করতে হলে আগে যে ঘটনাটা ঘটিয়েছে তাকে ধরতে হবে। এখানে আমরা প্রশাসনের কোন তৎপরতাই দেখছিনা।আরও এক স্বজন জানান, প্রশাসনের গাফিলতি অবশ্যই আছে।নিহতদের বেঁচে ফেরা একমাত্র বোন মুন্নী সুশীল ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, কাজ সম্পন্ন করে আমরা চলে আসছিলাম বাসায়। গাড়িটি পিছন দিক থেকে এসে চাপা দেয়। চাপা দেয়ার পর আবার পিছনে এসে মারার জন্য চাপা দেয়।মুন্নী সুশীলের স্বামী খগেশপ্রতি চন্দ্র বলেন, চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রক্তিম সুশীলের অবস্থা সংকটাপন্ন। তাকে বাঁচানো যাবে কি না, সন্দেহ। গত বুধবার রাতে সেখানকার আইসিইউতে ৭২ ঘণ্টা পার হয়েছে, কিন্তু এখনো তার নড়াচড়া নেই। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্লাবন সুশীলের অবস্থাও অপরিবর্তিত, উন্নতি হচ্ছে না। বুধবার দুপুরে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরে হঠাৎ তিনি মাটিতে পড়ে যান। এখনও তিনি কথা বলতে পারছেন না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মালুমঘাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবুল হোসেন জানান, আমরা আমাদের কাজ করছি। মামলার ফলাফল ৪-৫ দিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘাতক গাড়িচালক ও মালিককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।এদিকে, নিহতদের বাড়ি পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।ডুলাহাজারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসানুল ইসলাম আদর বলেন, ইতিমধ্যে জেনেছি গাড়ির মালিক ও চালককে চিহ্নিত করা হয়েছে।কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজ জানান, যেহেতু এটা খুবই মর্মান্তিক একটা ঘটনা। আমরা কক্সবাজার জেলা প্রশাসন নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও সহানুভূতি জ্ঞাপন করছি। তাদের সঙ্গে আমরাও সহমর্মী।উল্লেখ্য, গত ৮ই ফেব্রুয়ারি ভোরে পিকআপ ভ্যানের ধাক্কায় মানু রানীর পাঁচ ছেলে অনুপম সুশীল (৪৬), নিরুপম সুশীল (৪০), দীপক সুশীল (৩৫), চম্পক সুশীল (৩০) ও স্মরণ সুশীল (২৯) নিহত হন। আহত হন আরও তিন ভাই–বোন। ঘটনার ১০ দিন আগে তাদের বাবা সুরেশের মৃত্যু হয়। বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যোগ দিতে তারা ৯ ভাইবোন বাড়িতে সমবেত হয়েছিলেন। সেখানকার একটি মন্দিরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শেষে একসঙ্গে ৯ ভাইবোন (৭ ভাই ও ২ বোন) পায়ে হেঁটে বাড়িতে আসার জন্য সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ ঘটনায় নিহতদের ভাই প্লাবন সুশীল বাদী হয়ে চকরিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা আসামির বিরুদ্ধে মামলা করেন।