বুধবার, মার্চ ২৫, ২০২৬
Homeসারাদেশদক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল৩ মার্চ: যশোরে প্রথম শহীদ চারুবালা কর

৩ মার্চ: যশোরে প্রথম শহীদ চারুবালা কর

স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
যশোরবাসীর কাছে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ এক ঐতিহাসিক দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে এদিনই যশোরে প্রথম শহীদ হন চারুবালা কর। পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে তাঁর আত্মদান স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং যশোরজুড়ে প্রতিরোধ আন্দোলনকে বেগবান করে।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঈদগাহ ময়দান থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি বিশাল মিছিল বের হয়। দড়াটানা মোড়, কাপুড়িয়াপট্টি ও চৌরাস্তা হয়ে মিছিলটি রেল রোডে পৌঁছে। সরকারি খাদ্য গুদামের সামনে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের দেখে বিক্ষুব্ধ জনতা ইট ও জুতা নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে এক পাকসেনা ফাঁকা গুলি ছোঁড়ে। গুলিতে আকাশে উড়তে থাকা একটি চিল মারা পড়ে। মৃত চিলটিকে সামনে রেখে মিছিলটি ভোলা ট্যাংক সড়কে প্রবেশ করে।

সার্কিট হাউস এলাকায় পাক সেনাদের উপস্থিতি টের পেয়ে জনতা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। দুপুরের দিকে ঈদগাহ সংলগ্ন সড়ক দিয়ে হানাদার বাহিনীর গাড়ি অতিক্রম করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি শান্ত হয়। এ সময় খবর আসে, টেলিফোন ভবন দখল করেছে পাক সেনারা। উত্তেজিত ছাত্র-জনতার একটি অংশ সেখানে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।

হঠাৎ কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই টেলিফোন ভবনের ছাদ থেকে জনতার ওপর মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে হানাদার বাহিনী। টেলিফোন ভবনের পশ্চিম পাশে, বর্তমান হোটেল হাসান ইন্টারন্যাশনাল এলাকায় নিজ বাসায় অবস্থান করছিলেন নিঃসন্তান পূর্ণ চন্দ্র করের স্ত্রী চারুবালা কর। গোলপাতার ছাউনি ভেদ করে একটি বুলেট তাঁর মাথায় বিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থলেই শহীদ হন তিনি। যশোরে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহীদ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকেন চারুবালা কর।

সেদিন গুলিবর্ষণে আরও অনেকে আহত হন। শহীদ চারুবালার মরদেহ যশোর সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হলে পাক সেনারা সেখানে তালা ঝুলিয়ে দেয়। বাইরে হাজারো মানুষ মরদেহ গ্রহণের অপেক্ষায় অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে জনতা মর্গের তালা ভেঙে মরদেহ বের করে আনে। অস্তগামী সূর্যের আলোয় হাজারো মানুষের শবযাত্রা নীলগঞ্জ মহাশ্মশানের দিকে এগিয়ে যায়। শবযাত্রায় পুরুষদের পাশাপাশি অসংখ্য নারীও অংশ নেন। সবার চোখেমুখে ছিল প্রতিরোধের অঙ্গীকার।

চারুবালার মরদেহ নিয়ে যশোরের সর্বস্তরের মানুষ কালেক্টরেট ঘেরাও করে। এ সময় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ও পরবর্তী সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কালেক্টরেট ভবনের পাইপ বেয়ে উঠে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেন এবং সেখানে প্রতীকীভাবে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ৩ মার্চের এ ঘটনা যশোরসহ সারাদেশে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে।

নীলগঞ্জ মহাশ্মশানে সমাহিত করা হয় শহীদ চারুবালা করকে। বর্তমানে মহাশ্মশানের পাশে নদীর ধারে প্রগতী বালিকা বিদ্যালয়ের পেছনে তাঁর সমাধিস্থল রয়েছে বলে জানা যায়। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেখানে স্থায়ী কোনো স্মারকচিহ্ন গড়ে ওঠেনি; এক পাশে ইটের একটি সারি ছাড়া শহীদ চারুবালার স্মৃতি সংরক্ষণের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও যশোরবাসীর দাবি—প্রথম শহীদ চারুবালা করের স্মৃতি সংরক্ষণে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক, যাতে নতুন প্রজন্ম ইতিহাসের এ গৌরবগাথা জানতে পারে।

এই বিভাগের আরো খবর

জনপ্রিয়