বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৬, ২০২৬
Homeসারাদেশদক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলযশোরে তেল নিয়ে চলছে তেলেসমাতি

যশোরে তেল নিয়ে চলছে তেলেসমাতি

ভেল্কিবাজিতে চলছে কৃত্রিম সংকট

স্বাধীন মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

যশোরে তেল নিয়ে শুরু হয়েছে তেলেসমাতি। পেট্রোল পাম্প ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চলছে লুকোচুরি খেলা। সকাল ১০টা বাজতেই শহরের অধিকাংশ তেল পাম্পে তেল থাকছে না। কোনো কোনো তেল পাম্পে ‘সরকারি নির্দেশনায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত তেল বিক্রি বন্ধ’ লেখা পোস্টার টাঙিয়ে রাখছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, তেল পাম্পগুলো ভেল্কিবাজি করে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এদিকে, তেল মজুদ নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, ক্রেতারা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহ করছে।

শহরের বিভিন্ন তেল পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, শহরের বেশির ভাগ তেল পাম্পে তেল বিক্রি বন্ধ রয়েছে। কোনো কোনো পাম্পে ২ লিটার তেল বিক্রির সরকারি নির্দেশনা থাকলেও ১ দশমিক ৭২ লিটার তেল বিক্রি হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেল কিনতে না পেরে ক্রেতারা এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সূত্র বলছে, শহরের নিউমার্কেট এলাকার তেল পাম্পগুলো রাতের অন্ধকারে বোতলে ১০ লিটার পর্যন্ত এবং পুলেরহাটের আকিক তেল পাম্প মাত্র ১০০ টাকার তেল বিক্রি করছে। জেলার ৮টি উপজেলার অধিকাংশ তেল পাম্পে তেল বিক্রি নিয়ে ক্রেতা ও পাম্প মালিকদের মধ্যে লুকোচুরি চলছে। তারাগঞ্জ এলাকার হাসান ফিলিং স্টেশনে ‘ডিপো থেকে তেল বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, প্রয়োজনে ডিপোতেই খোঁজ নিতে পারেন’ লেখা স্টিকার দেখা গেছে।

শহরের মনিহার এলাকায় যাত্রীক পেট্রোলিয়াম সার্ভিস নামে তেল পাম্পে গিয়ে দেখা গেছে তেল সরবরাহের মেশিনে লেখা ‘সরকারি নির্দেশনায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত তেল বিক্রি বন্ধ।’

এ বিষয়ে কথা হয় তেল পাম্পের ম্যানেজার আতিকুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, থানা থেকে পুলিশ এসে বলে গেছেন এই সময়ের মধ্যে তেল বিক্রি বন্ধ। তিনি আরও জানান, দৈনিক হিসেবে তার তেল প্রয়োজন হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার লিটার পেট্রোল ও অকটেন। ডিজেল যায় ৯ হাজার লিটার। অকটেন ৪ থেকে ৫ দিন সরবরাহ নেই। ৪ দিন আগে পেট্রোল পেয়েছি ৩ হাজার লিটার। আমাদের পাম্প সারারাত খোলা থাকে। কিন্তু সরকারি নির্দেশনায় বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

এই পাম্পে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল আরোহী শামছুর রহমান বলেন, যশোর থেকে বাঘারপাড়ায় যাবো—২ শ টাকার তেলে যেতে পারবো না। একই পাম্প থেকে ঘুরেফিরে ২ বার তেল নিতে হচ্ছে।

ফয়সাল হোসেন নামে আরেক ক্রেতা বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় কম পেট্রোল পাচ্ছি। হঠাৎ করে তেলের এই সংকট রহস্যজনক মনে হচ্ছে।

হানিফ আনসারি ডলার বলেন, রাতে অনেকে প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হয়। রাতের বেলা তেল না দেওয়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সবুজ মিয়া নামে অন্য এক ক্রেতা বলেন, চারাভিটা, সরলাখানা, তারাগঞ্জ, চিত্রামোড়, ধলগ্রামসহ বেশ কয়েকটা পাম্পে গিয়ে ফিরে এসেছি। পাম্প থেকে বলা হচ্ছে, দুঃখিত তেল সরবরাহ নেই। ২ শত টাকা করে তেল দেবে বলেছে সেটাও পাচ্ছি না।

বেলা দেড়টায় মেসার্স মনিরউদ্দীন আহমেদ ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, ক্রেতারা তেল নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন।

রনি আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, পাম্পগুলো তেল মজুদ করছে দাম বাড়ানোর জন্য। আমরা পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছি না। প্রশাসনের উচিত পাম্পগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

মো. শামছুজ্জামান বলেন, ১ থেকে ২ লিটার তেল তো পাম্পগুলো দেবে। আমরা প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেল তো দূরে থাক ১ লিটারও পাচ্ছি না। একটা ভালো মানের গাড়ি ৫০ কিলোমিটার যেতেও তো ২ লিটার তেলের প্রয়োজন পড়ে।

এই পাম্পের ম্যানেজার মেহেদি হাসান বলেন, আমার প্রতিদিন চাহিদা ৩ হাজার লিটার পেট্রোল, সাড়ে ৩ হাজার লিটার অকটেন ও ৯ হাজার লিটার ডিজেল। আমি পাচ্ছি ২ হাজার লিটার পেট্রোল। অকটেন দিচ্ছে না। ডিজেল দিচ্ছে ৯ হাজার লিটার। যে কারণে সকাল ১০ থেকে ১১টার মধ্যে আমার তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন তেল এনে বিক্রি করতে হচ্ছে। আমাদের পরিবহন খরচ বেশি হলেও নির্দিষ্ট দামে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে।

চয়নিকা পেট্রোলিয়াম সার্ভিস নামে তেল পাম্পের ক্যাশিয়ার অজয় দাস বলেন, আমাকে ২ হাজার লিটার অকটেন দিয়েছে। আর কবে তেল দেবে এমন কোনো নির্দেশনা নেই। খুলনার ডিপো থেকে জানানো হয়েছে, এ মাসে তেল আর নাও দিতে পারে। রাত ১০টার পর আমাদের পাম্প বন্ধ থাকে। দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ লিটার তেল বিক্রি হয়। দুপুর ২টার পর তেল প্রায় শেষ হয়ে গেছে। পেট্রোল একদম নেই তেমনটা না, সামান্য আছে ডিসি-এসপিদের গাড়ির জন্য দেওয়া লাগে।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার বলেন, আমার জানা মতে কোন সময় তেল বিক্রি করা যাবে আর কোন সময় করা যাবে না—এমন কোনো নির্দেশনা নেই। পুলিশের পক্ষ থেকে তেল পাম্পে এমন নির্দেশনা কে দিয়েছে জানি না। তবে চুয়াডাঙ্গায় তেল নিয়ে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে সে কারণে কেউ কৌশল অবলম্বন করতে পারে।

যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাধারণ সম্পাদক তানভীরুল ইসলাম সোহান বলেন, আমার জানা মতে পর্যাপ্ত তেল আছে। মানুষ বেশি করে তেল কিনছে, সে কারণে তেল শেষ হচ্ছে। আমরা তেল পাম্প মালিকদের সঙ্গে কথা বলে পরে আপনাকে জানাবো।

বাংলাদেশ জ্বালানি তেল পরিবেশক সমিতি যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন বলেন, খুলনার ডিপো থেকে পেট্রোল পাম্পের চাহিদা অনুযায়ী তেল দেওয়া হচ্ছে না। যে তেল দিচ্ছে ক্রেতারা ক্রয় করে নিচ্ছে। যে কারণে পাম্পের তেল দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। পাম্পগুলো তেল সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত দিচ্ছে—এটা তো আরও তিন দিন আগের ঘটনা।

তেল সংকট ও ক্রেতাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজন সরকার বলেন, কোনো পাম্পের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে আমাদের বললে আমরা খোঁজ নিয়ে জানাতে পারবো। জেলা প্রশাসনের পক্ষে পেট্রোল পাম্প মালিক ও সাধারণ ক্রেতাদের উদ্দেশ্যে কোনো নির্দেশনা আছে কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, কষ্ট করে জেলা প্রশাসকের কাছে শুনে নিয়েন।

এদিকে, পেট্রোল পাম্প সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের নির্দিষ্ট মাসে পাম্পগুলো ডিপো থেকে যে পরিমাণ পেট্রোল ও অকটেন উত্তোলন করেছে তার ২০ শতাংশ কমিয়ে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে সুস্পষ্ট মন্তব্যের জন্য মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের খুলনা ডিপোর বিক্রয় শাখার ব্যবস্থাপক মো. মেহেদীর সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ডিপোতে কোনো ধরনের তেলের সংকট নেই। পেট্রোল পাম্পগুলো প্রতিদিন এক গাড়ি করে তেল নিতে চায়। হুজুগে তাদের বিক্রি বেড়েছে। আমরা তো আগের বরাদ্দের চেয়ে বেশি তেল দিতে পারবো না। রেশনিং পদ্ধতিতে আগের বরাদ্দের চেয়ে ২০ শতাংশ তেল কম সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) কর্তৃক কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক মনিটরিং ও কন্ট্রোল সেল গঠন করা হয়েছে। সেখানে দায়িত্বে থাকা খুলনা আঞ্চলিক কন্ট্রোল সেলের কর্মকর্তা ও মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড খুলনার সহকারী মহাব্যবস্থাপক ইনচার্জ (বিক্রয়) এমপিএল এস এম জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সিনিয়র সহকারী সচিব নাহিদা আক্তার তানিয়া এক প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। যেখানে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত ও নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয় যশোরের তেল নিয়ে তেলেসমাতির এই রহস্যের জট কবে খোলে।

এই বিভাগের আরো খবর

জনপ্রিয়