রহস্যে ঘেরা ৩০০ বছরের প্রাচীন ধর্মীয় উপাসনালয় নড়াইলের নিশিনাথতলা
রিপন বিশ্বাস, নড়াইল
চিত্রা নদীর বাঁধাঘাট থেকে স্নান করে ভেজা কাপড়ে পায়ে হেঁটে পাকুড়গাছে জল ও দুধ ঢালছেন ভক্তরা। কেউ গাছের মোটা ডালে ইট বেঁধে করছেন মানত, কেউ আবার রোগমুক্তির আশায় উপবাস থেকে গাছতলায় পূজা দিচ্ছেন।
নড়াইল শহরের ঐতিহ্যবাহী নিশিনাথতলা মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত প্রাচীন পাকুড়গাছকে ঘিরে প্রতি বছর বৈশাখ মাসজুড়ে এমনই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এই পাকুড়গাছে জল ও দুধ ঢাললে পূণ্য লাভ হয় এবং মনের ইচ্ছা পূরণ হয়। তাই বৈশাখ এলেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত ভক্ত সমবেত হন নিশিনাথতলায়। বিশেষ করে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা ও মানতের নানা আয়োজন।
গত মঙ্গলবার (৫ মে) সকাল থেকেই চিত্রা নদীর বাঁধাঘাটে ভক্তদের ভিড় দেখা যায়। স্নান শেষে ফুল, ফল, দুধ ও পবিত্র জল নিয়ে তারা আসেন পাকুড়গাছের নিচে। সেখানে জল ও দুধ ঢেলে পূজা-অর্চনা করেন। কেউ তেল ও সিঁদুর দেন, কেউ আবার বাতাসাসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসামগ্রী উৎসর্গ করেন। ভক্তদের উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ।
বাঁধাঘাট থেকে স্নান সেরে জল, ফুল ও ফলের ডালি হাতে মন্দিরের দিকে যাচ্ছিলেন ইলা রানী বিশ্বাস। গভীর ভক্তিভরে তিনি বলেন, চিত্রা নদীতে স্নান করে পবিত্র জল, ফুল, ফল, তেল ও সিঁদুর নিয়ে এসেছি নিশিনাথতলায় পূজা দিতে। বৈশাখ মাসে গাছে জল দিলে পুণ্য লাভ হয়—এই বিশ্বাসে প্রতি বছর এখানে আসি। জায়গাটি খুবই প্রসিদ্ধ।
একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী শিমুল পাঠক বলেন, ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে এখানে আসতাম। তখন মাসজুড়ে মেলা বসত। সার্কাস, পুতুল নাচ, যাত্রা ও মহানাম সংকীর্তনের আয়োজন হতো। এখন আগের মতো জৌলুস নেই, তবে নিশিনাথ বাবার নামে জল ও দুধ ঢালার উৎসব এখনো চলছে। এবারও মানত করেছি।
স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বহু বছর আগে চিত্রা নদীর তীরবর্তী এ অঞ্চল ছিল গভীর বন-জঙ্গলে ঘেরা। সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন দুর্ধর্ষ ডাকাত সরদার নিশিনাথ। পাকুড়গাছের নিচেই ছিল তার আস্তানা।
একদিন এক বৃদ্ধা ওই পথ দিয়ে মেয়ের বাড়ি যাওয়ার সময় ভয় পেয়ে মনে মনে মানত করেন—নিরাপদে পৌঁছাতে পারলে নিশিনাথের নামে পূজা দেবেন। পরে তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে নিশিনাথের মনে পরিবর্তন আসে। ধীরে ধীরে তিনি পাপের পথ ছেড়ে ধর্মসাধনায় মনোনিবেশ করেন। প্রতিদিন ভোরে স্নান শেষে পাকুড়গাছের নিচে সাধনায় বসতেন। একসময় তিনি সিদ্ধিলাভ করেন এবং সেখানেই দেহত্যাগ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
পরবর্তীতে স্থানীয়রা সেখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন। সময়ের পরিক্রমায় সেটিই পরিচিতি পায় “শ্রী শ্রী নিশিনাথতলা মন্দির” নামে।
নিশিনাথতলা মন্দির পরিচালনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক দাস বুড়ো জানান, চলতি বৈশাখ মাসজুড়ে মহানাম সংকীর্তনের আয়োজন করা হয়েছে। মাসের শেষ সপ্তাহে মেলা আরও জাঁকজমকপূর্ণ হবে বলেও জানান তিনি।
মন্দিরের পূজারী সুনীল চক্রবর্তী বলেন, ঠিক কত বছর ধরে এখানে পূজা হচ্ছে তা জানা নেই। তবে শুনে আসছি, এটি অন্তত ৩০০ বছরের পুরনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বৈশাখ এলেই ভক্তরা নদী থেকে জল এনে পাকুড়গাছের গোড়ায় ঢালেন। তাদের বিশ্বাস, নিশিনাথবাবার কাছে কেউ খালি হাতে ফেরে না।

























