Jashore , Thursday, 22 October 2026
সর্বশেষ:

প্রবাসীর ফেরার আনন্দ রূপ নিল মহাশোকে ; ভাঙ্গায় সড়ক দূর্ঘটনায় প্রবাসীসহ নিহত ৫

স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
যে বাড়িটিতে দীর্ঘ ১০ বছর পর মালয়েশিয়া প্রবাসী রাকিব হোসেনের ফেরার আনন্দে উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এক নির্মম সড়ক দুর্ঘটনা সেই আনন্দকে চিরকালের জন্য এক নিথর নীরবতায় রূপ দিল। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম এলাকায় ভোরের আলো ফোটার আগেই শেষ হয়ে গেছে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার এক সাজানো পরিবারের সব স্বপ্ন।

বিমানবন্দর থেকে প্রবাস ফেরত স্বজনকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ভোর পৌনে চারটার দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিকল ট্রাকের পেছনে দ্রুতগতির প্রাইভেটকারটি সজোরে ধাক্কা খায়। এতে প্রাইভেটকারটি দুমড়েমুচড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই চালকসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে চারজনই একই পরিবারের সদস্য। তারা হলেন, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের বালিডাঙ্গা গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী রাকিব হোসেন, তার মা নুরজাহান বেগম, বোন আয়েশা আক্তার এবং ভাই আরিফ হোসেন।

নিহত অপরজন হলেন প্রাইভেটকার চালক জাহিদ হোসেন (২৫)। সে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার গৌরপুর গ্রামের মো. ইসলামের পুত্র।

একসাথে পরিবারের চার স্বজনের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে ঝিকরগাছার বালিডাঙ্গা গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে এক অন্ধকার ছায়া। দীর্ঘ ১০ বছর পর ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ এক নিমেষেই রূপ নিয়েছে লাশের মিছিলে। খবরটি এলাকায় পৌঁছানোর পর থেকেই পুরো গ্রামে চলছে মাতম। নিহতের বাড়িতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রতিবেশীরা, কিন্তু কাউকেই সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা নেই কারও।

স্বজনদের আহাজারি আর বুকফাটা কান্নায় বালিডাঙ্গা গ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, কেউবা নির্বাক চেয়ে আছেন শূন্য উঠোনের দিকে। কোনোভাবেই এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো যখন গ্রামে আনা হবে, তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হবে। একই পরিবারের এই চার সদস্যকে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সেখানে পাশাপাশি খুঁদা হচ্ছে চারটি কবর। যে ভাই-বোন একসাথে বড় হয়েছে, যে মা তাদের আগলে রেখেছিলেন তারা সবাই এখন পাশাপাশি চার কবরে অনন্তকালের জন্য ঘুমিয়ে থাকবেন। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত কঠোর হৃদয়ের মানুষের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠছে।

এই মহাশূন্যতা আর ধ্বংসস্তূপের মাঝেও অলৌকিকভাবে সামান্য আঘাত পেয়ে বেঁচে আছে দুটি তাজা প্রাণ আট বছরের শিশু আশরাফুল হোসেন এবং মাত্র তিন বছরের কন্যাসন্তান তাসফিয়া। দুর্ঘটনাস্থলে যখন উদ্ধারকারীরা পৌঁছান, তখন চারপাশের রক্ত আর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া লোহার স্তূপের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল এই অবুঝ শিশুদের কান্নার আওয়াজ। বর্তমানে তারা ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চিকিৎসকদের আন্তরিক চেষ্টায় শরীরজুড়ে থাকা আঘাতের ক্ষত হয়তো একদিন শুকিয়ে যাবে, কিন্তু তারা যখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে— তখন আর তাদের পরম মমতার আপনজনদের দেখতে পাবে না।

তিন বছরের তাসফিয়া কিংবা আট বছরের আশরাফুল হয়তো এখনো জানেই না— যে মা, খালা আর মামারা একটু আগেও বুকে জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন, তারা আর কোনোদিন চোখ মেলবেন না। সুস্থ হয়ে ওঠার পর যখন তারা বুঝতে পারবে তাদের পুরো পৃথিবীটাই ফাঁকা হয়ে গেছে, তখন এই অবুঝ শিশুদের কে সামলাবে?

মাদারীপুরের শিবচর হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এম এম মুমতাছির মাহমুদ জানান, ভোরের দিকে ঢাকা থেকে যশোরগামী একটি দ্রুতগতির প্রাইভেটকার দাঁড়িয়ে থাকা বিকল ট্রাকের পেছনে ধাক্কা খায়। তীব্র গতির কারণে প্রাইভেটকারটি ট্রাকের নিচে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই দুই নারী ও দুই পুরুষ মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাকিব হোসেনকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর প্রাইভেটকারের চালক জাহিদ হোসেন দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতরে আটকে ছিলেন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ গাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে তার মরদেহ উদ্ধার করে। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি দুটি জব্দ করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information
Update Time : 04:32 pm, Tuesday, 2 June 2026
89 Time View

প্রবাসীর ফেরার আনন্দ রূপ নিল মহাশোকে ; ভাঙ্গায় সড়ক দূর্ঘটনায় প্রবাসীসহ নিহত ৫

Update Time : 04:32 pm, Tuesday, 2 June 2026

স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
যে বাড়িটিতে দীর্ঘ ১০ বছর পর মালয়েশিয়া প্রবাসী রাকিব হোসেনের ফেরার আনন্দে উৎসবের আমেজ থাকার কথা ছিল, মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এক নির্মম সড়ক দুর্ঘটনা সেই আনন্দকে চিরকালের জন্য এক নিথর নীরবতায় রূপ দিল। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের মালিগ্রাম এলাকায় ভোরের আলো ফোটার আগেই শেষ হয়ে গেছে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার এক সাজানো পরিবারের সব স্বপ্ন।

বিমানবন্দর থেকে প্রবাস ফেরত স্বজনকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আজ মঙ্গলবার (২ জুন) ভোর পৌনে চারটার দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বিকল ট্রাকের পেছনে দ্রুতগতির প্রাইভেটকারটি সজোরে ধাক্কা খায়। এতে প্রাইভেটকারটি দুমড়েমুচড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই চালকসহ ৫ জন নিহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে চারজনই একই পরিবারের সদস্য। তারা হলেন, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউনিয়নের বালিডাঙ্গা গ্রামের মালয়েশিয়া প্রবাসী রাকিব হোসেন, তার মা নুরজাহান বেগম, বোন আয়েশা আক্তার এবং ভাই আরিফ হোসেন।

নিহত অপরজন হলেন প্রাইভেটকার চালক জাহিদ হোসেন (২৫)। সে যশোরের মণিরামপুর উপজেলার গৌরপুর গ্রামের মো. ইসলামের পুত্র।

একসাথে পরিবারের চার স্বজনের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে ঝিকরগাছার বালিডাঙ্গা গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে এক অন্ধকার ছায়া। দীর্ঘ ১০ বছর পর ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ এক নিমেষেই রূপ নিয়েছে লাশের মিছিলে। খবরটি এলাকায় পৌঁছানোর পর থেকেই পুরো গ্রামে চলছে মাতম। নিহতের বাড়িতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন প্রতিবেশীরা, কিন্তু কাউকেই সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা জানা নেই কারও।

স্বজনদের আহাজারি আর বুকফাটা কান্নায় বালিডাঙ্গা গ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কেউ বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন, কেউবা নির্বাক চেয়ে আছেন শূন্য উঠোনের দিকে। কোনোভাবেই এই নির্মম বাস্তবতা মেনে নিতে পারছেন না স্বজনেরা।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো যখন গ্রামে আনা হবে, তখন এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হবে। একই পরিবারের এই চার সদস্যকে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সেখানে পাশাপাশি খুঁদা হচ্ছে চারটি কবর। যে ভাই-বোন একসাথে বড় হয়েছে, যে মা তাদের আগলে রেখেছিলেন তারা সবাই এখন পাশাপাশি চার কবরে অনন্তকালের জন্য ঘুমিয়ে থাকবেন। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত কঠোর হৃদয়ের মানুষের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠছে।

এই মহাশূন্যতা আর ধ্বংসস্তূপের মাঝেও অলৌকিকভাবে সামান্য আঘাত পেয়ে বেঁচে আছে দুটি তাজা প্রাণ আট বছরের শিশু আশরাফুল হোসেন এবং মাত্র তিন বছরের কন্যাসন্তান তাসফিয়া। দুর্ঘটনাস্থলে যখন উদ্ধারকারীরা পৌঁছান, তখন চারপাশের রক্ত আর দুমড়েমুচড়ে যাওয়া লোহার স্তূপের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল এই অবুঝ শিশুদের কান্নার আওয়াজ। বর্তমানে তারা ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

চিকিৎসকদের আন্তরিক চেষ্টায় শরীরজুড়ে থাকা আঘাতের ক্ষত হয়তো একদিন শুকিয়ে যাবে, কিন্তু তারা যখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে— তখন আর তাদের পরম মমতার আপনজনদের দেখতে পাবে না।

তিন বছরের তাসফিয়া কিংবা আট বছরের আশরাফুল হয়তো এখনো জানেই না— যে মা, খালা আর মামারা একটু আগেও বুকে জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন, তারা আর কোনোদিন চোখ মেলবেন না। সুস্থ হয়ে ওঠার পর যখন তারা বুঝতে পারবে তাদের পুরো পৃথিবীটাই ফাঁকা হয়ে গেছে, তখন এই অবুঝ শিশুদের কে সামলাবে?

মাদারীপুরের শিবচর হাইওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এম এম মুমতাছির মাহমুদ জানান, ভোরের দিকে ঢাকা থেকে যশোরগামী একটি দ্রুতগতির প্রাইভেটকার দাঁড়িয়ে থাকা বিকল ট্রাকের পেছনে ধাক্কা খায়। তীব্র গতির কারণে প্রাইভেটকারটি ট্রাকের নিচে ঢুকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই দুই নারী ও দুই পুরুষ মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে রাকিব হোসেনকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর প্রাইভেটকারের চালক জাহিদ হোসেন দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া গাড়ির ভেতরে আটকে ছিলেন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ গাড়ির ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে তার মরদেহ উদ্ধার করে। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়ি দুটি জব্দ করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।