‘পানি আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে’
১৪০ কোটি টাকার প্রকল্পেও ভাগ্য ফেরেনি
জলের সাথেই বসবাস ১৫০ গ্রামের মানুষের
নিজস্ব প্রতিবেদক
দুপুরের খাবার শেষে সাইকেল ঘাড়ে করে ঘর থেকে নামিয়ে কাদা-পানিময় রাস্তায় উঠছেন ৬০ বছরের বৃদ্ধ গোপাল চন্দ্র মন্ডল। অভয়নগর উপজেলার মশিহাটি এলাকার বাসিন্দা গোপালের বাড়ির উঠোনে এখন হাঁটু পানি। দীর্ঘস্বাস ফেলে তিনি বলেন, আমরা কয়েক বছর ধরে এই জলাবদ্ধতায় ভুগছি। ছেলেমেয়ে নিয়ে এভাবে বাঁচা যায় না। বাজারে যাব, রাস্তাঘাট সব পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বর্ষা বাড়লে আরও সমস্যা হবে। এখন হাঁটু পানি, ক’দিন পর কোমর পর্যন্ত পানি কুলোবে কি না সন্দেহ!
একই এলাকার শিপ্রা মন্ডল ক্ষোভ আর হতাশা মেশানো কণ্ঠে বললেন, আমাদের খোঁজখবর নেওয়ার মতো কেউ নাই। সরকার এখনও কিছু দিলো না। বাড়ি থেকে বের হতে গেলে কাপড় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা বিশাল সমস্যায় আছি, কোনো রাস্তাঘাট ঠিক নেই।
শুধু গোপাল কিংবা শিপ্রা মন্ডলী নন; দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কান্নার নাম ‘ভবদহ’। সরকার বদলায়, বছর ঘুরে বর্ষা আসে, কিন্তু এই জনপদের মানুষের ভাগ্যের চাকা একচুলও ঘোরে না।
স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ বলছিলেন, পানি আমাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশা করেছিলাম নদী খননের পর পরিত্রাণ পাব, কিন্তু তা হচ্ছে না। ঘরের নারীদের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে, চর্মরোগসহ নানাবিধ পানিবাহিত রোগে ভুগছে সবাই।
অভিযোগের আঙুল নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে নদী খনন, প্রকল্পরে মেয়াদ বাড়ানোর অপচেষ্টা, টেন্ডারের পরও আমডাঙ্গা খাল সংস্কার না করাসহ ভবদহের ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার দিকেও।
খলিসিয়া ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার আক্তার হোসেন ২১ ভেন্ট এলাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্লুইসগেট ঠিকমতো খোলা হয় না। বাড়িঘরে পানি উঠে যাচ্ছে। তিন মাস ধরে শুনছি এখানকার পাম্প মেশিন মেরামত করা হচ্ছে, কিন্তু কাজ শেষ হয় না। আমরা মরে যাব, তাও এদের মেশিন ঠিক হবে না!
যদিও গেটম্যান এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, পাম্প চালানোর নির্দেশনা না থাকা এবং জোয়ার-ভাটার নিয়ম মেনেই গেট ওঠানো-নামানো হচ্ছে।
সরেজমিনে জানা যায়, সম্প্রতি সরকার ভবদহের পানি নিরসনে ১৪০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তবে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি ও স্থানীয়দের দাবি, এই মেগা প্রকল্পও কাজের কাজ কিছু করছে না।
সংগ্রাম কমিটির সদস্য শেখড় চন্দ্র রায় বলেন, ৩০ বছরের এই জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। নদী খনন করা হয়েছে। তবে খর্নিয়া থেকে মধুখালী গেট পর্যন্ত ১৫ থেকে ২০ ফুট পলি জমেছে। নদী আড়বাঁধ দিয়ে খনন করা সম্ভব নয়। নদী খননের পাশাপাশি টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারাধার) চালু করতে হবে। তা না করে কেবল প্রকল্পের পর প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৩টি উপজেলার প্রায় ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত। যাতে এরই মধ্যে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
অন্যদিকে, যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী নদী রক্ষা কমিটির মিটিং এ জানিয়েছেন, খর্নিয়া এলাকায় নদীর বাঁধ তুলে দেওয়ার জন্য ভাসমান মেশিন চালানো হচ্ছে। দুটি মেশিনের সাহায্যে ভেতর থেকে প্রায় ৪০০ মিটার কাটতে পারলে জমা পলি সরে যাবে এবং পানিপ্রবাহ অনেকটা স্বাভাবিক হবে।
তবে ভবদহ এলাকার এই জলাবদ্ধতার টেকসই সমাধানের দাবিতে আন্দোলন আরও জোরালো হচ্ছে। ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ জানিয়েছেন, স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম চালু, সময়োপযোগী নদী খনন ও আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের দাবিতে আগামী সোমবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষ।

























