জাতীয় বীর কাজী আরেফ আহমেদেরজন্ম দিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলী

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Email

ফরিদ আহমেদ কুষ্টিয়া// জন্ম : ১৯৪২ সালের ৮ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার সম্ভ্রান্ত কাজী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কাজী আব্দুল কুদ্দুস সাহেব একজন সরকারি চাকুরী জীবি ছিলেন।

এ একজন ধর্মপ্রান মানুষ ছিলেন। পিতার মতই তিনি একজন সৎ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছিলেন। তার মাতা খন্দকার খোদেজা খাতুন একজন ধর্মপ্রাণ নারী ছিলেন। কাজী আরেফ আহমেদের দশ ভাই-বোন।

শিক্ষাজীবন : কাজী আরেফ আহমেদ ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে মাধ্যমিকশিক্ষা সমাপ্ত করে ও স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন, এরপর ঢাকা বিশবিদ্যালয়ে ভূগোল বিভাগে ভর্তি হন। আন্দোলন সংগ্রাম ও আইয়ুবি নির্যাতনে মাস্টার্স ডিগ্রি অসমাপ্ত থাকে।

ছাত্র রাজনীতি : ১৯৬৩ থেকে ১৯৭০ সালে পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে ছিলেন। এই সময়ে দীর্ঘদিন ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। এ সময়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে এবং আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে সামরিক শাসনের কবর রচনার কাজে তুখোড় ভুমিকা রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হলে, ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি হিসেবে কাজী আরেফ আহমেদ প্রথম সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দেন।

এই কর্মসূচীকে সারাদেশে রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী ও গন মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে বিশেষ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ এর গন অভ্যুত্থান এ দেশের মানুষের জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট। সকল সংগ্রামী মানুষ তখন এ খাতে প্রবাহিত হচ্ছে। পিছনে থাকাবার কোন অবকাশ নেই। এখানে পৌছে ওই অবিস্মরণীয় সময় একজন ছাত্রনেতা হিসেবে, একজন যুবক হিসেবে, একজন লড়াকু মানুষ হিসেবে, একজন নির্যাতিত ছাত্র হিসেবে, সর্বোপরি একজন যোদ্ধা হিসেবে অনন্য ভুমিকা রেখেছিলেন। সম-সাময়িকদের চোখে সেসব উজ্জল হয়ে আছে।

সে আন্দোলনের নেতৃত্তে থাকা সকল ছাত্রনেতাদের সাথে তিনি বিচক্ষণতা, নিরলশ শ্রম, ক্লান্তিহীন চেষ্টায় বাঙালী জাতীয়তাবাদের আবেগে মুক্তিযুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে আমাদের মরনপন যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নিউক্লিয়াস গঠন করেন। নিউক্লিয়াস গঠনে সহযোগী হিসাবে পেয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান এবং আব্দুর রাজ্জাককে।

তারা আঙ্গুল কেঁটে শপথ নিয়ে ছিলেন যতদিন বাংলাদেশ স্বাধীন না হবে বাংলার মানুষের মুক্তি না হবে ততদিন বিয়ে করবেন না। ততকালীন ছাত্র আন্দোলনের মূল সূতিকাগার ছিলো এই নিউক্লিয়াস। ১৯৭০ সালে গঠিত ‘জয় বাংলা বাহিনীর ” অন্যতম সংগঠক। কাজী আরেফ আহমেদ স্বাধীনতা সার্বভৌমত্তের প্রতিক জাতীয় পতাকার অন্যতম রুপকার। দীর্ঘদিন ধরে লালিত স্বাধীন বাংলাদেশের সপ্নস্বাদ ১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তার সুচনা লগ্নে কাজী আরেফ আহমেদ বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট এর অন্যতম নেতার ভুমিকা পালন করেন।

এই বাহিনীর নেতা হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে পশ্চিম রনাঙ্গনের ( বৃহত্তর পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, খুলনা ও বরিশাল ) নেতৃত্ব দেন। তিনি জনগনের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সৈরাচারী শোষনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা উত্তরকালে গঠিত দেশের প্রথম বিরোধী দল “জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল” জাসদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা।

আশির দশক থেকে নব্বুইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত জাসদের সভাপতি ছিলেন। তিনি স্বাধীনতা উত্তরকালে গনতান্ত্রিক সংগ্রামের বলিষ্ঠ মুখপাত্র দৈনিক গনকন্ঠের ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কৃষক সমাজের মুক্তির লক্ষ্যে জাতীয় কৃষকলীগের নেতৃত্তে থেকে কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলেন।

ভুমিহীন কৃষকদের সংগঠিত করার কাজে নিরলস পরিশ্রম করেছেন। কাজী আরেফ আহমেদ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের একজন সফল ও দু:সাহসী সংগঠক। তিনি অবৈধ ক্ষমতা দখলদারদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সংগ্রামে গ্রেফতার, হুলিয়া ও নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন।

১৯৮৭ – ৮৮ সাল পর্যন্ত তিনি কারা নির্যাতন ভোগ করেন। আপোষহীন সংগ্রামী নেতা এই সামরিক আইন ও শাসনের চির অবসানের লক্ষ্যে ৯০ এর গন অভ্যুত্থানের জঙ্গী নেতৃত্ব দেন। ১৯৯২ সালের ২৬ শে মার্চ দেশবাসী এক বিরল স্বাধীনতা উদযাপন করেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গন আদালত অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেখানে জামায়াতে ইসলামের আমীর ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের ফাঁসীর রায় হয়েছিলো এবং অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করে রায় ঘোষনা করা হয়েছিলো।

সাথে সাথে উল্লেখ করা হয়েছিলো, যে কোন নির্বাচিত গনতান্ত্রিক সরকার এ রায় কার্যকর করবে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে এ আন্দোলনের অন্যতম রুপকার ও সংগঠক ছিলেন কাজী আরেফ আহমেদ।