স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
যশোরের আকাশ আজ ভারী। কাকডাকা ভোর থেকে ঝিরঝিরে বৃষ্টি, কোথাও মুষলধারে। প্রকৃতিও যেন কাঁদছে এক মহান মানুষকে হারিয়ে। বৃষ্টিভেজা সেই দুপুরে শেষ বিদায় জানানো হলো সাংবাদিকতা ও মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গনের আলোকবর্তিকা, দৈনিক সংবাদ-এর বিশেষ প্রতিনিধি বীর মুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহ্কে।
আজ শনিবার (২৩ আগস্ট) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদানের পর তাকে যশোর কারবালা কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
শুক্রবার (২২ আগস্ট) সন্ধ্যায় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। কয়েক মাস ধরে হৃদরোগ ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন এ প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিক। গত ২৭ জুলাই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকার ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হন। দেশবরেণ্য চিকিৎসক অধ্যাপক এমএ রশিদের তত্ত্বাবধানে নিবিড় পরিচর্যায় ছিলেন। গত ১৯ আগস্ট হার্টে রিং স্থাপনের পর বৃহস্পতিবারই যশোরে ফেরেন। কিন্তু মাত্র একদিন পরই না-ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি।
শনিবার দুপুরে তার মরদেহ প্রথমে যশোর উদীচী কার্যালয়ে, পরে প্রেস ক্লাব ও জজকোর্ট প্রাঙ্গণে নিয়ে যাওয়া হয়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় ঈদগাহে না হয়ে জজকোর্ট চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান। সেখানে অসংখ্য সহকর্মী, রাজনৈতিক-সামাজিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিকামী মানুষ ও শুভানুধ্যায়ী শেষ বিদায় জানান অশ্রুসিক্ত চোখে। এরপর কারবালা কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
রুকুনউদ্দৌলাহ্র শৈশব-কৈশোর কেটেছে নওগাঁয়। তখন থেকেই তিনি ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সচেতন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে পরিবারের সঙ্গে ভারতে গিয়ে শিলিগুড়িতে প্রশিক্ষণ নেন। হাতে তুলে নেন অস্ত্র, অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কলমকে বেছে নেন সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় সাংবাদিকতায় নির্ভীকভাবে কাজ করে গেছেন। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তার কলম ছিল অগ্নিঝরা।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন এক দক্ষ লেখক। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে গ্রাম-গ্রামান্তরে, মুক্তিযুদ্ধে যশোর, আমার কৈশোর আমার মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের ভাবনা মানুষের কথা, ছোট ছোট কথা অচেনা মানুষ, পতাকার অক্ষত ভূমি ইত্যাদি। প্রতিটি বইয়ের পাতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে সময়ের সাক্ষ্য আর সংগ্রামের কাহিনি।
সহকর্মীরা তাকে মনে করেন সাংবাদিকতার এক প্রতিষ্ঠান। তারা বলেন, রুকুনউদ্দৌলাহ্ ছিলেন “একজন স্কুল অব জার্নালিজম।” নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছেন সততা, পেশাদারিত্ব, মানুষের পক্ষে কলম চালানোর শিক্ষা। তার চলে যাওয়া শুধু যশোর নয়, পুরো দেশের সাংবাদিকতার জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
যশোর আজ হারাল এক মুক্তিযোদ্ধাকে, হারাল এক নির্ভীক সাংবাদিককে, হারাল শিক্ষক ও লেখককে। তবে তার রেখে যাওয়া আলো নিভে যাবে না। তার স্মৃতি, লেখা, সংগ্রাম ও সত্যের পক্ষে অবস্থান চিরকাল পথ দেখাবে আগামী প্রজন্মকে।







