স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক
যশোরের কৃতি সন্তান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য এবং সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য (৮০) পরলোকগমন করেছেন। আজ বৃহস্পতিবার (৬ নভেম্বর) ভোর সাড়ে পাঁচটায় যশোর শহরের বেজপাড়ায় তার ভাড়া বাড়িতে বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
যশোরের রাজনীতিতে অ্যাডভোকেট পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য ছিলেন সততা ও আদর্শের এক উজ্জ্বল বাতিঘর। তিনি রাজনীতির সর্বোচ্চ স্থানে (জাতীয় সংসদ সদস্য) অধিষ্ঠিত হয়েও অর্থ-বিত্ত-বৈভব অর্জনের পথে হাঁটেননি। আমৃত্যু তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি ছিলেন অবিচল।
১৯৪০ সালের ১ মার্চ যশোর জেলার মণিরামপুর থানার পাড়ালা গ্রামে জন্ম নেওয়া পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য ছিলেন মৃত সুধীর কুমার ভট্টাচার্য্য ও মৃত ঊষা রানী ভট্টাচার্য্যরে সাত সন্তানের মধ্যে প্রথম। মণিরামপুর কলেজ থেকে শিক্ষকতা জীবন শুরু করে পরবর্তীতে তিনি ঐ কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। তিনি ছয় দফা ও এগারো দফার প্রচারণায় গ্রাম-গঞ্জে ছুটে বেড়িয়েছেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারে মণিরামপুরের জনসভায় তাঁর সুঠামদেহী ও সৌম্যকান্তি চেহারা বঙ্গবন্ধুর নজরে আসে। সেসময় বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, “তোর সাথে আবার দেখা হবে, কথা হবে।”
৭১-এর প্রাক্কালে যুদ্ধের সময় থানার ও.সি সাহেব তাঁকে ভারতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি একজন সংগঠক হিসাবে কলকাতার হাবড়ার বাণীপুর শরণার্থী ক্যাম্পের ইনচার্জের দায়িত্ব নেন এবং সেখানে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় শিশুদের জন্য তিনটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।
স্বাধীনতার পর, বঙ্গবন্ধুর দেওয়া কথানুযায়ী ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি মনোনয়ন পান এবং বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। সেই বছরই তিনি তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে মস্কোতে বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগ দেন এবং সেখানে ‘Independence and Economic Development’ শিরোনামে একটি গবেষণাপত্র পাঠ করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক তাকে পার্লামেন্টে যোগ দিতে খবর পাঠান। মোশতাক তাঁকে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি পার্টির প্রতিনিধি দলের সাথে ভারতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়ার জন্য বিশেষ একটি চিঠি নিয়ে যেতে বলেন, যেখানে মোশতাক নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। আদর্শচ্যুত না হয়ে পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য ধমক উপেক্ষা করে সেই চিঠি বহন করতে অস্বীকৃতি জানান এবং দ্রুত ঢাকা থেকে যশোরে ফিরে গোপনে চৌগাছা হয়ে ভারতে চলে যান। শেখ হাসিনার নির্দেশেই তিনি ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ভারতেই অবস্থান করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সমাজসেবা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। জাতীয় সংসদের সদস্য থাকাকালীন তিনি কেশবপুরে ১২টি এবং মণিরামপুরে ২৫টি প্রাইমারি স্কুল গড়ে তোলেন। গ্রামের স্কুল গোপালপুর স্কুল ও মণিরামপুর কলেজে বিজ্ঞানাগার আধুনিকায়নে তিনি বিপুল অর্থ সহযোগিতা করেন। এছাড়া, মণিরামপুরে হাসপাতাল, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি যশোর শহরের উদীচী, সুরধুনী, পুনশ্চসহ বহু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ছিলেন।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং ২০১৬ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সভাপতিমণ্ডলির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী মনিকা ভট্টাচার্য্য, দুই ছেলে ও দুই মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তাঁর বড় ছেলে বাবলু ভট্টাচার্য্য চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে যুক্ত এবং বড় মেয়ে তপতী আবৃত্তিকার হিসেবে পরিচিত। তাঁর মেজ ভাই স্বপন কুমার ভট্টাচার্য্যও সাবেক মন্ত্রী ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নীলগঞ্জ শ্মশানে আজ বিকেলে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।







