Jashore , Thursday, 22 October 2026
সর্বশেষ:

স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় ডা. ডোরার মৃত্যু: যশোরে সংবাদ সম্মেলনে বিচার দাবিতে পরিবার

স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক

রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় ডা. চাঁদ সুলতানা ডোরার মর্মান্তিক মৃত্যুর অভিযোগ তুলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তার স্বজনরা। শনিবার সকালে যশোর প্রেসক্লাবের হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ডোরার মা শিরিন সৈয়দা বেগম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তার বাবা মানসুর উদ্দিন, স্বামী ডা. মো. নজরুল ইসলাম, চাচা শেখ নিজাম উদ্দিন সুইট, মামা ফিরোজ উদ্দিন, এস এম শামীম এজাজসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও এলাকাবাসী।

লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, খুলনা মেডিকেল কলেজের কে-১৯ ব্যাচের মেধাবী শিক্ষার্থী ডা. চাঁদ সুলতানা ডোরা ২০১৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ৩৯তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রেসপিরেটরি মেডিসিন (পালমনোলজি) বিষয়ে এমডি কোর্স সম্পন্ন করেন এবং এমআরসিপি পার্ট-১ উত্তীর্ণ ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সম্ভাবনাময় চিকিৎসক।

পরিবার জানায়, ডা. ডোরা সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে স্কয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রেহনুমা জাহানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ২৯ জানুয়ারি রাত ১২টা ৩০ মিনিটে জ্বর, কাঁপুনি, বমি, শ্বাসকষ্ট ও গর্ভস্থ সন্তানের নড়াচড়া কমে যাওয়াসহ জটিল উপসর্গ নিয়ে তাকে স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়।

কিন্তু অভিযোগ করা হয়, এত গুরুতর অবস্থার রোগী হওয়া সত্ত্বেও তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। রাতেই আল্ট্রাসনোগ্রামে গর্ভের সন্তান মৃত বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ছিল চরম গাফিলতি। সংশ্লিষ্ট কনসালট্যান্ট ডা. রেহনুমা জাহান রাতে হাসপাতালে না এসে পরদিন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে অল্প সময়ের জন্য রোগীকে দেখেন এবং সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ পরিবারের।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয় এবং রোগীর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়। ডেলিভারি রুমে নেওয়ার পরও পর্যাপ্ত মনিটরিং করা হয়নি, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণ (ভাইটাল সাইন) পর্যবেক্ষণেও অবহেলা করা হয়।

ডোরার স্বামী ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, রোগীর অবস্থা শুরু থেকেই সংকটাপন্ন ছিল। কিন্তু চিকিৎসকরা বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে বারবার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি ভালো আছেন। বাস্তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি ঘটে।

পরিবারের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে প্রায় ১২ ঘণ্টা বিলম্ব করা হয়, যা মারাত্মক অবহেলার শামিল। এছাড়া সময়মতো এইচডিইউ বা আইসিইউতে স্থানান্তর না করে রোগীকে ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়। দুপুরের দিকে হঠাৎ করে তার অবস্থার অবনতি হলে স্বজনদের জানানো হয়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হলেও বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবার আরও অভিযোগ করে, পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় রোগীর অবস্থা সম্পর্কে স্বজনদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে এবং একাধিকবার ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর কারণ নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. রেহনুমা জাহানকে অবিলম্বে বরখাস্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বে থাকা অন্যান্য চিকিৎসক ও মেডিকেল টিমের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অভিযুক্ত চিকিৎসকের চিকিৎসা লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, একজন বিসিএস ক্যাডার চিকিৎসক যদি এমন অবহেলার শিকার হয়ে প্রাণ হারান, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।

এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information
Update Time : 05:54 pm, Saturday, 28 March 2026
71 Time View

স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় ডা. ডোরার মৃত্যু: যশোরে সংবাদ সম্মেলনে বিচার দাবিতে পরিবার

Update Time : 05:54 pm, Saturday, 28 March 2026

স্বাধীন কন্ঠ ডেস্ক

রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় ডা. চাঁদ সুলতানা ডোরার মর্মান্তিক মৃত্যুর অভিযোগ তুলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তার স্বজনরা। শনিবার সকালে যশোর প্রেসক্লাবের হলরুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ডোরার মা শিরিন সৈয়দা বেগম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তার বাবা মানসুর উদ্দিন, স্বামী ডা. মো. নজরুল ইসলাম, চাচা শেখ নিজাম উদ্দিন সুইট, মামা ফিরোজ উদ্দিন, এস এম শামীম এজাজসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও এলাকাবাসী।

লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, খুলনা মেডিকেল কলেজের কে-১৯ ব্যাচের মেধাবী শিক্ষার্থী ডা. চাঁদ সুলতানা ডোরা ২০১৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ৩৯তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। তিনি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রেসপিরেটরি মেডিসিন (পালমনোলজি) বিষয়ে এমডি কোর্স সম্পন্ন করেন এবং এমআরসিপি পার্ট-১ উত্তীর্ণ ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সম্ভাবনাময় চিকিৎসক।

পরিবার জানায়, ডা. ডোরা সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে স্কয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. রেহনুমা জাহানের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। গত ২৯ জানুয়ারি রাত ১২টা ৩০ মিনিটে জ্বর, কাঁপুনি, বমি, শ্বাসকষ্ট ও গর্ভস্থ সন্তানের নড়াচড়া কমে যাওয়াসহ জটিল উপসর্গ নিয়ে তাকে স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়।

কিন্তু অভিযোগ করা হয়, এত গুরুতর অবস্থার রোগী হওয়া সত্ত্বেও তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। রাতেই আল্ট্রাসনোগ্রামে গর্ভের সন্তান মৃত বলে নিশ্চিত হওয়া গেলেও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় ছিল চরম গাফিলতি। সংশ্লিষ্ট কনসালট্যান্ট ডা. রেহনুমা জাহান রাতে হাসপাতালে না এসে পরদিন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে অল্প সময়ের জন্য রোগীকে দেখেন এবং সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই চিকিৎসা প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ পরিবারের।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয় এবং রোগীর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়। ডেলিভারি রুমে নেওয়ার পরও পর্যাপ্ত মনিটরিং করা হয়নি, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণ (ভাইটাল সাইন) পর্যবেক্ষণেও অবহেলা করা হয়।

ডোরার স্বামী ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, রোগীর অবস্থা শুরু থেকেই সংকটাপন্ন ছিল। কিন্তু চিকিৎসকরা বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়ে বারবার আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে তিনি ভালো আছেন। বাস্তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি ঘটে।

পরিবারের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে প্রায় ১২ ঘণ্টা বিলম্ব করা হয়, যা মারাত্মক অবহেলার শামিল। এছাড়া সময়মতো এইচডিইউ বা আইসিইউতে স্থানান্তর না করে রোগীকে ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়। দুপুরের দিকে হঠাৎ করে তার অবস্থার অবনতি হলে স্বজনদের জানানো হয়, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। পরে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হলেও বিকাল ৩টা ৫৫ মিনিটে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবার আরও অভিযোগ করে, পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় রোগীর অবস্থা সম্পর্কে স্বজনদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে এবং একাধিকবার ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর কারণ নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. রেহনুমা জাহানকে অবিলম্বে বরখাস্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দায়িত্বে থাকা অন্যান্য চিকিৎসক ও মেডিকেল টিমের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অভিযুক্ত চিকিৎসকের চিকিৎসা লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, একজন বিসিএস ক্যাডার চিকিৎসক যদি এমন অবহেলার শিকার হয়ে প্রাণ হারান, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।

এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।