Jashore , Sunday, 25 October 2026
সর্বশেষ:
চার দিনের সরকারি সফরে জাপানের উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৯ মাস পর খুলছে সেন্টমার্টিন: পর্যটকদের জন্য নতুন নিয়ম ও শত টাকা ফি নির্ধারণ যশোরে অনুমতি ছাড়াই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গাছের ডাল কেটে বিক্রির অভিযোগ বেনাপোল সীমান্তে বিজিবির অভিযানে মাদক ও ভারতীয় মালামাল আটক দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ন্যানো-ইউরিয়ার পেটেন্ট পেলেন যবিপ্রবির গবেষক ড. জাভেদ যশোরে কলিমুদ্দিন সরদার ট্রাস্টের উদ্যোগে বিনামূল্যে চিকিৎসাক্যাম্প অনুষ্ঠিত যশোরে মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে জমজ শিশুদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ টানা আট দিনের ছুটি শেষে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দরে পুরোদমে আমদানি-রপ্তানি শুরু জাতিসংঘের অর্থবহ সংস্কারে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির প্রকাশ্যে চুমু দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করেছেন এক দলের প্রধান নেতা: রাশেদ খাঁন

ইটের ওপর ইট গেঁথে যিনি বুনে চলেন শিশুদের স্বপ্নের ভবিষ্যৎ

এক আলোকোজ্জ্বল মানুষের গল্প

​নিজস্ব প্রতিবেদক

রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারাদিন চলে ইটের পর ইট সাজানোর কাজ। কড়া রোদে পিঠ পুড়ে যায়, কপালে জমে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাতে লেগে থাকে সিমেন্ট-বালির রুক্ষ প্রলেপ। তিনি হোসাইন আহমেদ। পেশায় একজন সাধারণ রাজমিস্ত্রি। কিন্তু এই রুক্ষ হাতের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক পরম মায়াবী ও কোমল হৃদয়। যে হাত দিয়ে তিনি বহুতল ভবনের দেয়াল তোলেন, সেই হাত দিয়েই গত ১৬ বছর ধরে হাজারো শিক্ষার্থীর বুকে বুনে চলেছেন স্বপ্নের ভবিষ্যৎ।

 

​যশোরের কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর গ্রামের এই মানুষটি আজ পুরো এলাকায় এক পরিচিত নাম, এক নীরব বিপ্লবের প্রতীক। নিজের ঘাম ঝরানো উপার্জনের একটা বড় অংশ তিনি তুলে দেন মফস্বলের সুবিধাবঞ্চিত ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে।

​”আমি হয়তো নিজে বড় কোনো অট্টালিকা বানাতে পারি না, কিন্তু আমার দেওয়া একটা কলম দিয়ে যদি কোনো সন্তান তার ভাগ্য লিখে নিতে পারে—তবেই আমার রাজমিস্ত্রি জীবন সার্থক।” — হোসাইন আহমেদ

​

​বৃহস্পতিবার সকালে কেশবপুর সরকারি পাইলট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে দেখা গেল এক উৎসবমুখর পরিবেশ। এসএসসি ব্যাচের ২৪৭ জন শিক্ষার্থীর চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। তাদের প্রত্যেকের হাতে শোভা পাচ্ছে একটি করে স্কেল ও কলম। দাতা কোনো বড় শিল্পপতি বা রাজনৈতিক নেতা নন, স্বয়ং হোসাইন আহমেদ।

 

​তার এই মানবিক যাত্রা আজ নতুন নয়। দীর্ঘ ১৬টি বছর ধরে তিনি উপজেলার প্রতিটি কোনায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত কেশবপুরের প্রায় ১০টি কলেজ এবং ৮৫টি হাই স্কুল ও মাদ্রাসায় নিজের সাইকেলে চড়ে শিক্ষা উপকরণ পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। জেএসসি, এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষা এলেই পরীক্ষার্থীদের জন্য উপহার নিয়ে হাজির হন এই প্রচারবিমুখ মানুষটি।

 

 

​পারিবারিক অভাব-অনটন আর সংসারের নিত্যদিনের খরচ সামলে শিক্ষার্থীদের জন্য টাকা বাঁচানো মোটেও সহজ নয়। কিন্তু হোসাইন আহমেদের কাছে এটি কোনো বাড়তি কাজ নয়, বরং জীবনের অপরিহার্য অংশ। শুধু কলম-খাতাই নয়, ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে যখন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। তখন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় কয়েল ও মশা তাড়ানোর সামগ্রী কিনে পৌঁছে দেন তিনি।

 

​হোসাইন আহমেদের এই মহোৎসবের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি বোধহয় লুকিয়ে আছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মাঝে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জেএসসি পরীক্ষার পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এমন ৭ জন কিশোর-কিশোরীকে তিনি নিজে খুঁজে বের করেন। তাদের মস্তিস্কে আবার ফিরিয়ে দেন পড়াশোনার স্বপ্ন, জোগান দেন সাহস ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। হোসাইন আহমেদের সেই ভালোবাসার জোরেই পরবর্তীতে তারা সবাই সফলভাবে এসএসসি পাস করে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছে।

​

​নিজের এই অনন্য কাজ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হোসাইন আহমেদের চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে। বিনয়ের সাথে তিনি বলেন, সারাদিন খাটাখাটনি করে যখন শরীরটা ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন এই বাচ্চাদের হাসিমুখ দেখলে আমার সব কষ্ট নিমেষেই দূর হয়ে যায়। এই কাজ আমাকে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি দেয়। আমি যতদিন বেঁচে আছি, আমার এই রুক্ষ হাতগুলো দিয়ে বাচ্চাদের শিক্ষার আলোয় একটুখানি ছায়া দিয়ে যেতে চাই।

 

​কেশবপুরের স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকেরা মনে করেন, হোসাইন আহমেদ কেবল একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। যেখানে বড় বড় বিত্তশালীরা সমাজ গঠনে এগিয়ে আসতে দ্বিধা বোধ করেন, সেখানে একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের এই দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক ত্যাগ এক বিরল দৃষ্টান্ত। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে এবং তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হোসাইন আহমেদের এই উপহারগুলো ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

 

​ইটের দেয়াল একদিন হয়তো পুরনো হয়ে খসে পড়বে, কিন্তু হোসাইন আহমেদ পরম মমতায় শিক্ষার্থীদের মনে ভালোবাসার যে ইমারত গড়ে তুলছেন, তার স্থায়িত্ব যে চিরকালের।

Please Share This Post in Your Social Media

About Author Information
Update Time : 06:11 pm, Thursday, 25 June 2026
49 Time View

ইটের ওপর ইট গেঁথে যিনি বুনে চলেন শিশুদের স্বপ্নের ভবিষ্যৎ

Update Time : 06:11 pm, Thursday, 25 June 2026

এক আলোকোজ্জ্বল মানুষের গল্প

​নিজস্ব প্রতিবেদক

রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারাদিন চলে ইটের পর ইট সাজানোর কাজ। কড়া রোদে পিঠ পুড়ে যায়, কপালে জমে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হাতে লেগে থাকে সিমেন্ট-বালির রুক্ষ প্রলেপ। তিনি হোসাইন আহমেদ। পেশায় একজন সাধারণ রাজমিস্ত্রি। কিন্তু এই রুক্ষ হাতের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক পরম মায়াবী ও কোমল হৃদয়। যে হাত দিয়ে তিনি বহুতল ভবনের দেয়াল তোলেন, সেই হাত দিয়েই গত ১৬ বছর ধরে হাজারো শিক্ষার্থীর বুকে বুনে চলেছেন স্বপ্নের ভবিষ্যৎ।

 

​যশোরের কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর গ্রামের এই মানুষটি আজ পুরো এলাকায় এক পরিচিত নাম, এক নীরব বিপ্লবের প্রতীক। নিজের ঘাম ঝরানো উপার্জনের একটা বড় অংশ তিনি তুলে দেন মফস্বলের সুবিধাবঞ্চিত ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে।

​”আমি হয়তো নিজে বড় কোনো অট্টালিকা বানাতে পারি না, কিন্তু আমার দেওয়া একটা কলম দিয়ে যদি কোনো সন্তান তার ভাগ্য লিখে নিতে পারে—তবেই আমার রাজমিস্ত্রি জীবন সার্থক।” — হোসাইন আহমেদ

​

​বৃহস্পতিবার সকালে কেশবপুর সরকারি পাইলট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে দেখা গেল এক উৎসবমুখর পরিবেশ। এসএসসি ব্যাচের ২৪৭ জন শিক্ষার্থীর চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক। তাদের প্রত্যেকের হাতে শোভা পাচ্ছে একটি করে স্কেল ও কলম। দাতা কোনো বড় শিল্পপতি বা রাজনৈতিক নেতা নন, স্বয়ং হোসাইন আহমেদ।

 

​তার এই মানবিক যাত্রা আজ নতুন নয়। দীর্ঘ ১৬টি বছর ধরে তিনি উপজেলার প্রতিটি কোনায় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত কেশবপুরের প্রায় ১০টি কলেজ এবং ৮৫টি হাই স্কুল ও মাদ্রাসায় নিজের সাইকেলে চড়ে শিক্ষা উপকরণ পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। জেএসসি, এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষা এলেই পরীক্ষার্থীদের জন্য উপহার নিয়ে হাজির হন এই প্রচারবিমুখ মানুষটি।

 

 

​পারিবারিক অভাব-অনটন আর সংসারের নিত্যদিনের খরচ সামলে শিক্ষার্থীদের জন্য টাকা বাঁচানো মোটেও সহজ নয়। কিন্তু হোসাইন আহমেদের কাছে এটি কোনো বাড়তি কাজ নয়, বরং জীবনের অপরিহার্য অংশ। শুধু কলম-খাতাই নয়, ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে যখন ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। তখন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় কয়েল ও মশা তাড়ানোর সামগ্রী কিনে পৌঁছে দেন তিনি।

 

​হোসাইন আহমেদের এই মহোৎসবের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়টি বোধহয় লুকিয়ে আছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের মাঝে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জেএসসি পরীক্ষার পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এমন ৭ জন কিশোর-কিশোরীকে তিনি নিজে খুঁজে বের করেন। তাদের মস্তিস্কে আবার ফিরিয়ে দেন পড়াশোনার স্বপ্ন, জোগান দেন সাহস ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। হোসাইন আহমেদের সেই ভালোবাসার জোরেই পরবর্তীতে তারা সবাই সফলভাবে এসএসসি পাস করে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখছে।

​

​নিজের এই অনন্য কাজ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হোসাইন আহমেদের চোখ দুটো চিকচিক করে ওঠে। বিনয়ের সাথে তিনি বলেন, সারাদিন খাটাখাটনি করে যখন শরীরটা ক্লান্ত হয়ে যায়, তখন এই বাচ্চাদের হাসিমুখ দেখলে আমার সব কষ্ট নিমেষেই দূর হয়ে যায়। এই কাজ আমাকে এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি দেয়। আমি যতদিন বেঁচে আছি, আমার এই রুক্ষ হাতগুলো দিয়ে বাচ্চাদের শিক্ষার আলোয় একটুখানি ছায়া দিয়ে যেতে চাই।

 

​কেশবপুরের স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকেরা মনে করেন, হোসাইন আহমেদ কেবল একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। যেখানে বড় বড় বিত্তশালীরা সমাজ গঠনে এগিয়ে আসতে দ্বিধা বোধ করেন, সেখানে একজন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের এই দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক ত্যাগ এক বিরল দৃষ্টান্ত। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে এবং তাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হোসাইন আহমেদের এই উপহারগুলো ম্যাজিকের মতো কাজ করে।

 

​ইটের দেয়াল একদিন হয়তো পুরনো হয়ে খসে পড়বে, কিন্তু হোসাইন আহমেদ পরম মমতায় শিক্ষার্থীদের মনে ভালোবাসার যে ইমারত গড়ে তুলছেন, তার স্থায়িত্ব যে চিরকালের।