উজানের ঢলে প্লাবিত হচ্ছে সুনামগঞ্জের হাওর, দিশেহারা কৃষক
সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি// উজানের ঢলে সুনামগঞ্জের ১১টি হাওরে প্রায় ৪ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। তবে কৃষকদের তথ্য অনুযায়ী, এরইমধ্যে ডুবে গেছে অন্তত সাত হাজার হেক্টর ফসলি জমি।
প্রতিদিনই নতুন নতুন হাওরে ঢুকছে পানি।দিরাইয়ের বৈশাখীর বাঁধ ভেঙে চাপতির হাওরে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর কাঁচা ধান তলিয়ে গেছে। এছাড়া, ভারত থেকে আসা ঢলে গত কয়েকদিনে শাল্লার বাঘারবন, কৌয়ারবন, পুটিয়ারবন গৌবরহরি হাওরের ফসলি জমি ডুবে গেছে। দিরাইয়ে টাংনির হাওরে পানি ঢুকলেও কৃষক, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের চেষ্টায় বাঁধ মেরামত করে পানি ঠেকানো গেছে।তাহিরপুরে টাঙ্গুয়ার হাওর, ধর্মপাশায় ডুবাইলের হাওর ডুবে গেছে।এছাড়াও ঝুঁকিতে রয়েছে চন্দ্র সোনার তাল হাওরের ২ হাজার ৯’শ হেক্টর কাঁচা ধানের জমি। বিভিন্ন হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধে দেখা দেয়া ফাটল বন্ধ করতে স্বেচ্ছা শ্রমে কাজ করছে হাজারো মানুষ। কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার হাওরাঞ্চলেও পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে ফসল।ধর্মপাশার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রুবেল আহমদ বলেন, বাঁধ ভাঙায় নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, বারহাট্টার কিছু অংশের ফসল ডুবে যাবে। বাঁধ ভাঙায় কমপক্ষে দুই হাজার হেক্টর ফসল ডুববে। স্থানীয় সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোকারম হোসেন বলেন, বাঁধের যে অংশে ফাটল ধরেছিল, সেই অংশ মেরামত করতে করতে বিকেলে অন্য অংশ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করে। তিনি বলেন, বাঁধের কাজ কারা করেছে আমি জানি না, আমি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার আগেই কাজ দেওয়া হয়েছে।শাল্লার বাসিন্দা অমন জানান, উজানের পানিতে ফসলের সর্বনাশ হতে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে সর্বশেষ অকাল বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়েছিল। এবার ধান কাটার প্রায় শেষ মুহূর্তে হাওর ডুবতে যাচ্ছে। তাই মানুষের মুখে হাসি নেই। চাপা কান্না বিরাজ করছে। অনেকেই বাঁধ এলাকায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। সর্বশক্তি নিয়োগ করে সবাই মিলে ফসল রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।এদিকে নেত্রকোনার হাওরঅধ্যুষিত ছয়টি উপজেলার কৃষকরা ১৩৪টি হাওরের ফসল রক্ষা নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছেন। ইতোমধ্যে খালিয়াজুরীর চুনাইহাওর, বাইনারদরচরসহ তিনটি হাওর পানিতে তলিয়ে গেছে। কির্তনখোলা বাঁধে দেখা দিয়েছে ফাঁটল। ৪১ হাজার হেক্টর জমির ধান শেষ পর্যন্ত কাটতে পারবেন কি না এ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। খালিয়াজুরী এলাকার কৃষক কালু জানান, ভাটি এলাকায় এক ফসলের জমি। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি। আমরা জমির ধান দিয়েই পুরো বছর চলি। একবার ফসল ডুবলে পাঁচ বছর পর্যন্ত আমাদের কষ্ট হয়। অভাব দেখা দেয় গোটা অঞ্চলে।গত মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্রসোনার তাল হাওরের ডুবাইল বাঁধ ভেঙে ১৮৫ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়েছে। সুনামগঞ্জের উজানের নদ-নদীতে পানি কিছুটা কমলেও ভাটির নদীগুলোতে পাহাড়ি ঢলের চাপে ঝুঁকির মুখে রয়েছে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলো; যা নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষক। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, তিনটি বাঁধের মধ্যে শাল্লা উপজেলার দুটি তাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিইসি) কাজের বাইরে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বরাত দিয়ে সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহুরুল ইসলাম বুধবার বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টায় মেঘালয়ে বা তৎসংলগ্ন সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস নেই। উত্তর পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি স্থিতিশীল আছে।৮০ ভাগ ধান পাকলেই কাটার পরামর্শউজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ধান। বিভিন্ন নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে ধানের জমি। জেলার ইটনার পর এবার নিকলী উপজেলায় প্লাবিত হচ্ছে কাঁচা-পাকা ধানের জমি। ৮০ ভাগ ধান পাকলেই দ্রুত কেটে ফেলতে পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি অফিস।তবে চরাঞ্চল ছাড়া এখনো প্রধান প্রধান হাওর সুরক্ষিত রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ফসলরক্ষা বাঁধের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কবস্থায় রয়েছে প্রশাসন। গত এক সপ্তাহে জেলার ইটনা ও নিকলীর নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলে প্রায় ৭শ একর ধান পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. সাইফুল আলম। তিনি জানান, এখনো ফসলরক্ষা বাঁধের ভেতর পানি প্রবেশ করেনি। নদী তীরবর্তী নিচু এলাকার ধান ডুবেছে। তবে ৮০ ভাগ ধান পাকলেই দ্রুত কেটে ফেলতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিশোরগঞ্জে চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে।বাকি ৯২ ভাগ বাঁধের আংশিক কাজ সম্পন্নসুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ধীরগতির পাশাপাশি ৫৮ ভাগ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে অনিয়ম হয়েছে বলে উঠে এসেছে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার জরিপে। রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গণশুনানি ছাড়াই পিআইসি গঠনেরও অভিযোগ রয়েছে।জরিপে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত সময়ে মাত্র ৮ ভাগ ফসল রক্ষা বাঁধে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাকি ৯২ ভাগ বাঁধের আংশিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সব মিলিয়ে বাঁধে মাটি ভরাট, ঘাস লাগানোসহ সার্বিকভাবে গড়ে ৬২ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।সংশোধিত কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী ৫০ মিটার দূর থেকে বাঁধের মাটি আনার কথা থাকলেও ৩৫ ভাগ বাঁধে এই নিয়ম মানা হয়নি। অনিয়মের মাধ্যমে বাঁধের কাছ থেকে মাটি দেওয়া হয়েছে। যেসব বাঁধে মাটির কাজ সম্পন্ন করা হয়নি।
এসব বাঁধে দুরমুজ (কম্পেকশন) ও ঢাল বজায় রাখার কাজও অসম্পূর্ণ।নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ার পেছনে প্রকল্প প্রাক্কলন ও পিআইসি গঠনে বিলম্ব, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, হাওর থেকে দেরিতে পানি নামা ও ড্রেজার মেশিনের স্বল্পতা রয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঁধের মাটির দুষ্প্রাপ্যতা ও প্রকল্প গঠনে অনিয়মের সমস্যা পুরনো। হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধের বিকল্প হিসেবে উজান ও ভাটিতে নদী খনন জরুরি। নির্মাণ করতে হবে স্থায়ী বাঁধ, খনন করতে হবে নদী। রাজনৈতিক বিবেচনায় কাজ পাওয়া বন্ধ, কাজের হাত বদল ঠেকানো জরুরি। বিচারের আওতায় আনতে হবে অপরাধীদের। অন্যথায় হাওরের সর্বনাশ ঠেকানো যাবে না। নষ্ট হবে ভাটির মূল্যবান সোনালি ফসল।



























