টুপটুপ রিসোর্টে আগুন: ১১ দিন পর পাশাপাশি কবরে শায়িত একই পরিবারের ৪ জন
নিজস্ব প্রতিবেদক
কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত যশোরের মণিরামপুর উপজেলার একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ ১১ দিন পর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছেছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে উপজেলার মোহনপুর গ্রামের বাড়িতে মরদেহগুলো পৌঁছালে শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়। ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। অন্যদিকে, পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়ার দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন এলাকাবাসীও।
নিহতরা হলেন মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা খাতুন এবং তাঁদের দুই মেয়ে ইনায়া ও ইহানা। বুধবার বেলা তিনটার দিকে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁদের দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টের অব্যবস্থাপনার কারণে তাঁদের পরিবারের চার সদস্যের প্রাণহানি ঘটেছে। তাঁরা এ ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্ট বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
মোহনপুরের পশ্চিমপাড়ায় ‘ফারজানা ম্যানশন’ নামের দোতলা বাড়িতে একাই থাকেন মতিয়ার রহমান। তাঁর দুই ছেলে চাকরির কারণে গ্রামের বাইরে থাকতেন। কিন্তু এখন সেই বাড়িতেই ফিরেছেন ছেলের মরদেহ, সঙ্গে পুত্রবধূ ও দুই নাতনির নিথর দেহ। বুধবার দুপুরে বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড়। বাড়ির বারান্দার পাশে একটি চেয়ারে বসে আছেন মতিয়ার রহমান। তাঁকে ঘিরে স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারিয়ে তিনি যেন বাকরুদ্ধ।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মতিয়ার রহমান বলেন, আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়। তখন সে আমাকে বলেছিল, বাবা তুমি চিন্তা করো না। তোমার নাতনিরা সি-বিচে আছে, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরব। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেয়ো। সেটাই ছিল শেষ কথা। আর কথা হবে না।
নাতনিদের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ছুটিতে গ্রামে এলে নাতনিরা বাড়ি মাতিয়ে রাখত। তাঁদের সঙ্গে কত খেলাধুলা করতেন তিনি। এখন আর কিছুই হবে না। ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুরাও আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তাঁর সোনার মানিকেরা কত কষ্ট পেয়েছে, সেই ভাবনাই তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে।
নিহত নাহিদুর রহমানের ফুফা আব্দুল লতিফ বলেন, কর্মজীবী মানুষ একটু সময় পেলেই বিনোদনের জন্য রিসোর্টে যান। কিন্তু সেই রিসোর্ট যদি অনিয়ন্ত্রিত হয় কিংবা সেখানে অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে মানুষের জীবন সব সময় ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
তিনি বলেন, এমন অব্যবস্থাপনার কারণে তাজা প্রাণগুলো অকালে ঝরে গেল। এর দায়ভার কে নেবে? তাঁদের একটি পরিবার শেষ হয়ে গেছে। নিহতদের আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা দূর করতে হবে এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অগ্নিনির্বাপণ প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকায় এমন মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নিহত চারজনকে দাফনের জন্য বুধবার সকাল থেকেই পারিবারিক কবরস্থানে কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করেন গোরখোদক। নাহিদের মায়ের কবরের পাশে সমাহিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হয় নাহিদ, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে।
পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়ার দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ষাটোর্ধ্ব রবিউল ইসলাম। তিনি মোহনপুরের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রবিউল ইসলাম বলেন, এত দিন শুধু শুনেছেন, একসঙ্গে একাধিক মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে। এবার নিজের চোখে দেখছেন, পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়েছে। একই পরিবারের চারজনকে দাফন করা হবে। এর আগে তাঁদের গ্রামে এমন দৃশ্য দেখেননি তিনি।
একটি পরিবারের চার সদস্যের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে মোহনপুর গ্রামজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা শেষবারের মতো প্রিয় মানুষগুলোর মুখ দেখার অপেক্ষায় বাড়িতে ভিড় করেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, পূজার ছুটিতে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা খাতুন এবং দুই মেয়ে ইনায়া ও ইহানা। পরদিন ১৬ অক্টোবর তাঁরা কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। ১৮ অক্টোবর দুপুরে তাঁদের রিসোর্ট ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই ১৭ অক্টোবর ভোরে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে একই পরিবারের চার সদস্যসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়।
নাহিদুর রহমান ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের পর নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। গত সোমবার বিকেলে কক্সবাজার পুলিশ ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পায়। এরপর আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঙ্গলবার দুপুরে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
দীর্ঘ ১১ দিন পর স্বজনদের কাছে ফিরলেও নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে আর জীবিত ফিরে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাঁদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকাহত পরিবার ও এলাকাবাসীর এখন একটাই দাবি—অগ্নিকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।























