দেশবিরোধী চুক্তি প্রতিহত করার ঘোষণা বামপন্থী নেতাদের
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন বামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতারা।শুক্রবার বিকেলে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের কেন্দ্রীয় সমাবেশে একথা বলেন নেতারা। তাঁরা বলেছেন, বামপন্থী শক্তি শেষ হয়ে যায়নি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আসে, এমন যেকোনো চুক্তির বিরুদ্ধে তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার মেয়াদের শেষ পর্যায়ে বিদেশিদের সঙ্গে যেসব চুক্তি করেছে, সেগুলো দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এসব চুক্তির বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
সমাবেশে গণসংগীত পরিবেশন করেন বিবর্তন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ, চারণ ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা।
সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রশিদ ফিরোজের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টির কেন্দ্রীয় নির্বাহী সভাপতি কমরেড আবদুল আলী, জাতীয় গণফ্রন্টের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক কমরেড রজত হুদা, গণমুক্তি ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সদস্য শিপলুল বারী রতু, বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা মাহাবুব, হারুনুর রশিদ ভূঁইয়া, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মশররেফা মিশু এবং বাসদ (মার্ক্সবাদী)-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মাসুদ রানা।
বিদেশিদের কাছে দেশের সম্পদ তুলে দেওয়ার অভিযোগ
বক্তব্যে ফজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলে আসছে। তবে এ দেশের মানুষ বারবার আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সেই ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছে। শ্রমিক, কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে দেশের সম্পদ রক্ষার আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তি করে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন। এসব চুক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বামপন্থী এই নেতা বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে রক্ত দিয়েছে। কিন্তু বৈষম্য দূর হয়নি। দেশের সম্পদ ও অর্থনীতির ওপর সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফুলবাড়ী, সুন্দরবন ও বন্দর নিয়ে উদ্বেগ
বক্তারা ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। তাঁরা বলেন, ফুলবাড়ীর মানুষ নিজেদের জীবন ও রক্ত দিয়ে কয়লাখনির বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। আবারও সেখানে বিদেশি কোম্পানির হাতে কয়লা উত্তোলনের দায়িত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা প্রতিহত করা হবে।
ফজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, ফুলবাড়ীর মানুষের আত্মত্যাগ উপেক্ষা করে সেখানে কয়লাখনি নিয়ে নতুন করে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। একইভাবে সুন্দরবন, নিউমুরিং টার্মিনালসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগেরও বিরোধিতা করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব উদ্যোগ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
বাড়ছে বৈষম্য, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমজীবী মানুষ
সমাবেশে বক্তারা দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের দাবি, একদিকে ধনী মানুষের সম্পদ বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেণির মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশের সম্পদ ও অর্থনীতির ওপর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব বাড়ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
বক্তারা বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি। বরং আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারও দেশের স্বার্থবিরোধী নীতি ও চুক্তির পথে হাঁটছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
তাঁরা আরও বলেন, দেশের সম্পদ রক্ষা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্য দূর করতে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তাঁরা।




























