ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধান ও টিআরএম চালুর দাবি
যশোরে অবস্থান কর্মসূচি ও স্মারকলিপি প্রদান
নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধ যশোরের ভবদহ অঞ্চলের স্থায়ী সমাধান এবং বিলে বিলে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট বা জোয়ারাধার) বাস্তবায়নের দাবিতে যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও স্মারকলিপি প্রদান করেছে ‘ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি’। সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে মণিরামপুর, কেশবপুর ও অভয়নগরসহ জলাবদ্ধতাকবলিত এলাকার শত শত ভুক্তভোগী মানুষ অংশ নেন।
কর্মসূচির শুরুতে লাঙল, কাস্তে, শাপলা ও জলাবদ্ধতার প্রতীকী উপকরণ হাতে নিয়ে মিছিলসহকারে কালেক্টরেট চত্বরে জড়ো হন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। পরে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেও নির্ধারিত অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান তাঁরা।
সংগঠনের সভাপতি অনিল বিশ্বাসের সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন যশোর জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন।
সমাবেশে বক্তব্য দেন কপোতাক্ষ নদ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হিরু, ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি রাশেদ খান, ডুমুরিয়ার আহ্বায়ক অধ্যাপক আমানউল্লাহ, সুন্দরদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল, পায়রা ইউনিয়নের নেতা মাসুদ আজাদ, উদীচীর রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ, আজিজুর রহমান, আমিনুর রহমান মামুন, সাবেক মেয়র মারুফ হোসেন, ভুক্তভোগী নেত্রী বাসন্তী মণ্ডল, শেকড় বিশ্বাস, সুকেন্দু বিশ্বাস, সাধন বিশ্বাস ও শিবপদ বিশ্বাসসহ আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।
সমাবেশে বক্তারা ভবদহের করুণ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বলেন, প্রতি বছর ৬ থেকে ৭ মাস এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে থাকে। কৃষিজমি, ফসল, মাছের ঘের, বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট ধ্বংস হয়ে জনজীবন চরম মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে।
নেত্রী বাসন্তী মণ্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৃষ্টির পানি উঠানে পড়ার আগেই ঘরে পড়ে। আমাদের দুঃখের শেষ নেই; দ্রুত ঘরবাড়ি, খাদ্য ও রাস্তাঘাট ঠিক করে দিতে হবে। পায়রা ইউনিয়নের নেতা মাসুদ আজাদ বলেন, আমাদের কোথাও কোনো ফসল নেই, খাবার নেই।
ডুমুরিয়ার আহ্বায়ক অধ্যাপক আমানউল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ওয়াবদার রাস্তার ওপর থেকে মাটি বা পলি গিয়ে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিলে বিলে টিআরএম চালু না হলে এবং বিল সমতল না হলে আগামী দিনে এই অঞ্চলে সন্তানদের বসবাস করার মতো পরিবেশ থাকবে না। অন্যদিকে বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল বলেন, একের পর এক সরকার পরিবর্তন হলেও ভবদহবাসীর ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন হয়নি।
সংগ্রাম কমিটির নেতারা ভবদহ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে নদী ও খাল খনন, আমডাঙা খালের দ্রুত সংস্কার, খর্নিয়া সেতুর পাশের আড়বাঁধ অপসারণ এবং ভবদহের বিলগুলোতে অবিলম্বে টিআরএম চালুর দাবি জানান। পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, প্রকল্পনির্ভর কার্যক্রম এবং কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির কারণেই এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
অতিথির বক্তব্যে জেলা পরিষদ প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ভবদহবাসীর দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় বিল খুকশিয়ায় টিআরএম চালু করা হয়েছিল, যার সুফল সে সময় এলাকার মানুষ পেয়েছিলেন। তিনি আমডাঙা খালের কচুরিপনা অপসারণের তাগিদ দেন এবং আন্দোলনকারীদের সহায়তায় জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ১ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেন।
ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবল কবির জাহিদ বলেন, ভবদহ এলাকা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সরকারের কিছু কর্মকর্তার কালক্ষেপন রয়েছে। আমাদের একটাই দাবি টিআরএম দিতে হবে। এর কোনা বিকল্প সমাধান হতে পারে না।
অবস্থান কর্মসূচি শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপি গ্রহণের সময় জেলা প্রশাসক বলেন, আমরা টিআরএম চালুর জন্য ইতোমধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছি। জেলা প্রশাসক হিসেবে এই সংকট নিরসনে যা যা করা দরকার, সব করা হবে। তিনি আন্দোলনকারীদের এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণ জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায় ভবদহ সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।























