‘কৃষক না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না, সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভেঙে ফসলের ন্যায্যমূল্য দিন’
—বাগেরহাট বাজারে খেতমজুর সমিতির বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃবৃন্দ
নিজস্ব প্রতিবেদক
‘মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে রয়েছে। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পার হয়ে গেলেও আমাদের দেশের কৃষকের ভাগ্যের কোনো উন্নয়ন বা পরিবর্তন হয়নি। যখনই যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা কৃষকের সঙ্গে কেবল প্রতারণাই করে গেছে। শাসকগোষ্ঠী বারবার পুঁজিবাদী ও ব্যবসায়ী শ্রেণির কালোবাজারিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কৃষি খাত এবং কৃষির সঙ্গে জড়িত সব ধরনের পণ্য ও কাঁচামালের দাম হু-হু করে বাড়িয়েছে। অথচ যুগের পর যুগ হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও কৃষক তাঁর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।’
বৃহস্পতিবার বিকেলে যশোর সদর উপজেলার বাগেরহাট বাজারে জাতীয় খেতমজুর সমিতি যশোর সদর উপজেলা শাখা আয়োজিত এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ ও পথসভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক তসলিম-উর রহমান এসব ক্ষোভপ্রকাশ করেন।
বিক্ষোভ সমাবেশে বর্তমান চাষাবাদ মৌসুমের চরম সংকট তুলে ধরে তসলিম-উর রহমান বলেন, আজকে চরম চাষাবাদের ভরা মৌসুমেও কৃষক চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ, সার ও জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না। কৃষককে বাজারে চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। সরকার এক লাফে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। যা কৃষকের পেটে লাথি মারার সামিল। শুধু তা-ই নয়, নতুন করে সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়েছে। যেখানে সরকারি দলের নেতারা নিজেদের ইচ্ছেমতো লোকজনকে ডিলার হিসেবে বসিয়ে লুটপাটের নতুন বন্দোবস্ত করছেন।
২৪-এর গণ-আন্দোলনের চেতনা ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি আরও বলেন, ২৪-এর ঐতিহাসিক গণ-আন্দোলনে এ দেশের বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ছাত্র সমাজের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কৃষক, মজুর ও চাষারা রাজপথে রক্ত দিয়েছেন, আন্দোলন করেছেন। কিন্তু সে বৈষম্যমুক্ত সমাজব্যবস্থা গড়ার যে কথা ছিল, সরকার আজ সেই মূল প্রতিশ্রুতি থেকে অনেক দূরে পিছিয়ে এসেছে। গণ-আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এসে আমেরিকার সঙ্গে একের পর এক গোলামি চুক্তি সই করে গেছে। সেসব চুক্তিতে কী শর্ত ছিল, তা জনগণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি।
বর্তমান সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও দ্রব্যমূল্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখন বিএনপির সরকার ক্ষমতায় এসে দেখছি বোয়িং বিমান কেনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। সারা দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। আর সরকার চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সার, বিদ্যুৎ ও তেলের দাম চড়া করে, কৃষকের রক্তচুষা সেই টাকা দিয়ে বোয়িং বিমান কিনছে। একই সঙ্গে আমেরিকা থেকে নানা খাদ্যপণ্য ও মাংস আমদানি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে সে মাংস কিসের—শুয়োরের নাকি গরুর, তাও আমরা সাধারণ মানুষ জানতে পারব না। সরকারের এই সব গোলামি চুক্তি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এ দেশের সাধারণ চাষা-মজুরের জীবন-জীবিকার ওপর চরম বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় আঞ্চলিক সমস্যা ও জলাবদ্ধতার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই খেতমজুর নেতা বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে এই বাগেরহাট এলাকায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের এমপি ও প্রভাবশালী নেতারা একছত্র প্রভাবে বিপুল জমি ক্রয় করে আবাসন প্রকল্প তৈরি করেছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে নিচু জমি ও জলাশয়গুলো মাটি দিয়ে ভরাট করে উঁচু করা হয়েছিল। ফলে পুরো এলাকায় প্রকৃতির ওপর ভয়াবহ বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দেখা দিয়েছে মারাত্মক ও স্থায়ী জলাবদ্ধতা। এই এলাকার প্রাণ মুক্তেশ্বরী নদী ও হরি নদী নাব্য হারিয়েছে। যার প্রভাবে বিল হরিণায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার রূপ নিয়েছে এবং কৃষক আজ তাঁর উৎপাদিত সোনালী ফসল ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারছেন না।
সরকারের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তসলিম-উর রহমান বলেন, আমরা এই গণ-বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে স্পষ্টভাষে বলতে চাই—আসুন, এ দেশের কৃষকদের বাঁচান। কারণ কৃষক বাঁচলে তবেই দেশ বাঁচবে। এ দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যস্থতাকারী লুটেরা ও পুঁজিপতিদের হাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে অবিলম্বে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। সার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের নির্বিঘ্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং সবকিছুর বর্ধিত মূল্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি দেশবিরোধী মার্কিন গোলামি চুক্তির বিস্তারিত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে এবং দেশের স্বার্থবিরোধী সব চুক্তি বাতিল করতে হবে।
সমাবেশ থেকে খেতমজুর সমিতির পক্ষ থেকে বেশ কিছু জরুরি দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, কৃষক বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও নীতি বাস্তবায়ন করা। ন্যায্যমূল্যে সারসহ সকল কৃষি উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।ডিজেলসহ জ্বালানি তেলের বর্ধিত মূল্য অবিলম্বে প্রত্যাহার করা। কৃষি খাতে ভর্তুকি মূল্যে ডিজেল ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। কৃষি খাতের সকল স্তরের দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধ করা। মুক্তেশ্বরী ও হরি নদী পুনখনন করে বিল হরিণার স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসন করা।
জাতীয় খেতমজুর সমিতি যশোর সদর উপজেলার এই বিক্ষোভ সমাবেশ ও পথসভাটি পরিচালনা ও সঞ্চালনা করেন বিপ্লবী যুবমৈত্রী যশোরের সদস্য শাকিল আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন, জাতীয় খেতমজুর সমিতি যশোর জেলা কমিটির অন্যতম শীর্ষ নেতা শাহাবুদ্দিন বাটুল।
সমাবেশে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জেলা দপ্তর সম্পাদক পলাশ বিশ্বাস, কৃষকনেতা নেতা রজব আলী, হযরত আলী, আব্দুস সাত্তার ও আব্দুল মালেক প্রমুখ।























